নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » অলসের হাত পরিণত হোক কর্মীর হাতে

অলসের হাত পরিণত হোক কর্মীর হাতে

আবদুল মজিদ, সালেহা বেগম, শর্মিলা বড়য়া ছেমন খাতুনওরা চারজন ভিক্ষুক। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর এলাকায় তাদের বাড়ি। দীর্ঘদিন থেকে তারা ভিক্ষাবৃত্তি পেশায় নিয়োজিত ছিলো। বছরের আগস্ট মাসে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে তারা এলো বেরিয়ে। তাদের অলস হাত পরিণত হয়েছে এখন কর্মীর হাতে। ক্ষুদ্র ব্যবসা করে তারা এখন ইনকাম করছে। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে আবদুল মজিদ বিক্রি করছেন ভ্যানগাড়ি করে সবজি। সালেহা বেগম বাঁশবেত দিয়ে কুটির শিল্প সামগ্রী বানিয়ে বিক্রি করছে। শর্মিলা বড়য়া মাথায় ফেরি করে এলাকায়এলাকায় শুটকি বিক্রি করেন। আর ছেমন খাতুন করেছেন লাকড়ির ব্যবসা। চালাচ্ছে সুন্দরভাবে সংসার। আলাপচারিতায় তারা জানান, ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাদেরকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মাহবুব আলম।
উপজেলা প্রশাসনের দেয়া স্বল্প পুঁজি নিয়ে তারা শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসা। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তাদের ব্যবসা লাভের মুখ দেখে। আবদুল মজিদের দৈনিক আয় ১হাজার টাকা। সালেহা বেগমের ৫০০ টাকা,শর্মিলা বড়য়ার ৬০০ টাকা এবং ছেমন খাতুনের ৫০০ টাকা আয় হয়। শুধু তা নয় সালেহা বেগম লাভের টাকা দিয়ে ২টি ছাগলও কিনেছে। তারা এখন ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণা করে। অন্যদেরকে নিষেধ করে ভিক্ষা করো না। কাজকর্ম করে খাও।
চার জন ভিক্ষুক দেশদশের জন্য দৃষ্টান্ত। অলস হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করা যায় যে দৃষ্টান্ত তারা দেখিয়েছে। ভিক্ষুক সমাজ তারা গর্বিত করেছে। উজ্জীবিত করেছে অলস হাতকে। দেশের ভিক্ষুক সমাজসহ অলস ব্যক্তি তাদেরকে অনুসরণঅনুকরণ করবে। এদের দেখাদেখি দেশের অন্যান্য অলস ব্যক্তি ভিক্ষুকের হাত কর্মীর হাতে পরিণত হবে। কেননা ভিক্ষুকের ভিক্ষাবৃত্তি অলস ব্যক্তির হাত জাতীয় জীবনে অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
দেশে ভিক্ষুকের কোন সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও এদেশের গ্রামগঞ্জে, শহরেবন্দরে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ভিক্ষুক দেখা যায় না। অন্ধ, পঙ্গু, বোবা, রুগ্ন এবং বিভিন্ন ধরণের ভিক্ষুক দেখা যায়। তারা ভিক্ষা করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার অঙ্গভঙ্গি, চিৎকার, গান, ছলনা, প্রতারণা প্রবঞ্চনার আশ্রয় নেয়। জীবন যতই কঠিন হচ্ছে ভিক্ষুকের ভিক্ষাবৃত্তির ধরণ ততই পাল্টাচ্ছে। ভিক্ষা শব্দের অর্থ প্রার্থনা, সাহায্য চাওয়া। আর ভিক্ষাবৃত্তি মানে ভিক্ষা করে জীবনধারণ। বিনা পরিশ্রমে মানুষের করুণা দয়া হাত পেতে গ্রহণ করে জীবিকা অর্জনের নাম হচ্ছে ভিক্ষা।
ভিক্ষা প্রাচীন পেশা। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ভিক্ষুক রয়েছে। তবে এদেশের মতো ভিক্ষাবৃত্তি পৃথিবীর কোন দেশে নেই। ফলে এদেশের ভিক্ষাবৃত্তি একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কেননা ভিক্ষাবৃত্তি ব্যক্তি জীবনকে যেমন চরমভাবে বিড়ম্বিত করে তেমনি জাতীয় জীবনে সৃষ্টি করে জটিলতা। কর্মহীন, পরিশ্রমকাতর ভিক্ষুক শ্রেণী জাতির বোঝা জাতির কলঙ্কযারা সমাজ তথা রাষ্ট্রকে দিন দিন পঙ্গু করে দিচ্ছে। ফলে সমাজে নানা প্রকার অসামাজিক কার্যকলাপের জন্ম নিচ্ছে। তারা বিভিন্ন ধরণের অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়। তারা পরিবেশকে নোংরা করে এবং নানা প্রকার রোগব্যাধির বিস্তার ঘটায়। যেখানেসেখানে ভিক্ষুকের বিচরণ এবং বসবাস পরিবেশ সৌন্দর্য শৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে।
অপরদিকে অলস বেকার ব্যক্তিরা সমাজের বোঝা। দেশে কিছ কিছুু অলস ব্যক্তি আছে যারা অন্যের উপর নির্ভর করে চলে। কর্মদক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বসে বসে খায়। কাজ করতে চাই না। অথচ ব্যক্তির শয়তানের কারখানা। আর কিছু মানুষ আছে স্ট্যাটার্স অনুযায়ী চাকুরি, কাজ বা মনের মতো কাজ না পেয়ে বসে থাকে। যাদেরকে আমরা বেকার বলি। দেশের বেকার মানুষেরও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। মনের মতো কাজের জন্য বসে না থেকে চলার উপযোগী কাজ বা চাকুরী পেলেও নিতে হবে।
দেশে বেকারের পরিসংখ্যান থাকলেও ভিক্ষুকের কোন পরিসংখ্যান নেই। সরকারিভাবেও ভিক্ষুকের কোন হিসেব নেই। কাদেরকে ভিক্ষুক বলা হচ্ছে তাও পরিষ্কার নয়। অনেক ধরণের ভিক্ষুক আছে যারা প্রতারকরুপী ব্যবসায়ী। তবে ভিক্ষুকরা কোন না কোনভাবে অসহায়। তাদের পুনর্বাসন করা দেশের নৈতিক দায়িত্ব। সম্প্রতি সরকার দেশের ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদ্বুদ্ধকরণ, পুনর্বাসন বিকল্প কর্মস্থানের মাধ্যমে দেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। ভিক্ষুকের সংখ্যা ধরণ জানার জন্য ভিক্ষুক জরীপের কাজ চলছে। রাজধানীসহ দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের কাজ শুরু হয়েছে। ভিক্ষুকদেরকে ভিক্ষাবৃত্তির পথ থেকে সরিয়ে রোজগারের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোন কোন উপজেলায় জোরালোভাবে ভিক্ষুক পুনর্বাসন ভিক্ষুকমুক্তকরণের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের কোন কোন উপজেলা বা ইউনিয়নভিক্ষুকমুক্তএলাকা হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত: চট্টগ্রাম জেলার ১৫ টি উপজেলায় ভিক্ষুকের ডাটাবেজ তৈরী হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হিসেব মতে, জেলার ১৫টি উপজেলায় ভিক্ষুক রয়েছে হাজার ১৩২জন। এসব ভিক্ষুকদের পুর্নবাসনের কাজ চলছে। রোজগারের সুবিধায় ক্ষুদ তাদেরকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য পুঁজি দেয়া হচ্ছে। অনেক এলাকায় ভিক্ষুকদেরকে পুঁজি দেয়া হয়েছে। ব্যবসায় ক্ষতি হলেও দেয়া হচ্ছে পুঁজি। যাতে করে ভিক্ষুকের অলস হাত দিয়ে উন্নয়ন আসুক। যে সব এলাকায় মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার রয়েছে। সেখানেই ভিক্ষুকরা সফল হচ্ছে। যার দৃষ্টান্ত লোহাগাড়ার চার ভিক্ষুক। দেশের ভিক্ষুক অলস ব্যক্তিকে পুনর্বাসন শুধু সরকারের একার কাজ নয়। বিভিন্ন সরকারিবেসরকারি ব্যাংক, এনজিও এবং ধনী শ্রেনীর মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। যার যার এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা এদের পুর্নবাসনের কাজ করা প্রয়োজন। কেননা দেশকে উন্নত দেশে তৈরীতে অলস ব্যক্তির হাত কর্মীর হাতে পরিণতকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি।
২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ভিক্ষুকমুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করার কথা রয়েছে সরকারের। ভিক্ষুকমুক্ত দেশ পরিণতকরণে সরকারকে সহযোগিতা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যার যার অবস্থান থেকে আমরা ভিক্ষাবৃত্তি রোধে ভূমিকা পালন করতে পারি। দেশের ধনী শ্রেনীর সমাজের পাশে ভিক্ষুক থাকবে এটি হয় না। কিংবা দেশে কর্মক্ষম উদ্যেমী ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তির পেশায় থাকবে তাও হয় না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ভিক্ষুকের বা অলস ব্যক্তির হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। কর্মীর হাতে পরিণত করতে হবে। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ ২০৪১ সালে উন্নত আয়ের দেশে পরিণতকরণে এটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে

লেখক : সহ: অধ্যাপক, আলহাজ¦ মোস্তফিজুর রহমান কলেজ, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম