নিজস্ব প্রতিবেদক

মাঝিরঘাট, সদরঘাট, মাদারবাড়ির গুদাম মালিক, ট্রাক মালিক এবং শ্রমিকদের জোরজুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছেন আমদানিকারকরা। তারা এসব এলাকায় মাল মজুদ কমিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে নিজস্ব ব্যবস্থায় পণ্য মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।
খাতুনগঞ্জের কয়েকটি ট্রেডিং হাউসের নির্বাহীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, এসব এলাকার গুদামে মাল মজুদ রেখে প্রতিটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এসব এলাকার গুদামে যে পরিমাণে মাল রাখা হয়, ডেলিভারি নেয়ার সেই পরিমাণ পাওয়া যায় না। মাল যখন রাখা হয় তখন ছোলা মসুরের বস্তায় ৫০ কেজি, গম সরিষার বস্তায় ৮০ কেজি এবং গুঁড়োদুধের বস্তায় ২৫ কেজি থাকে। কিন্তু ডেলিভারি নেয়ার সময় সেই পরিমাণ পাওয়া যায় না। ৫০ কেজির বস্তায় পাওয়া যায় ৪৮ কেজি। একইভাবে ৮০ কেজির বস্তায় পাওয়া যায় ৭৬ কেজি। মজুদ রাখা থেকে ডেলিভারির মাঝখানে বাকি মাল হাওয়া হয়ে যায়। বস্তা থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় চুরি করে নেয়া হয় বাকি মাল। এটা ওপেনসিক্রেট। এই নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। চিটাগাং চেম্বারসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দেনদরবারও হয়েছে অনেক। কিন্তু কোন প্রতিকার মেলেনি। এরপরও যারা বাধ্য হয়ে সেখানে মাল রাখেন তাদেরকে এই ক্ষতিটা মেনে নিয়েই মজুদ রাখতে হয়।
আমদানিকারকদের পরিবেশকরা তাই মাঝিরঘাট, সদরঘাট এবং মাদারবাড়ি এলাকার গুদাম থেকে পণ্য ডেলিভারি নিতে চান না। গুদাম ব্যবসায়ীদের অর্থবিত্তের উৎস সম্পর্কে দুর্নীতি দমন বিভাগ এবং আয়কর বিভাগকে দিয়ে যথাযথ তদন্ত হওয়া আবশ্যক বলে মনে করেন আমদানিকারকরা। তারা আরও বলেন, শুধু যে বস্তা থেকে মাল পাচার করে নেয়া হয় তা নয়, ডেলিভারি পর্যায়েও গুদামকেন্দ্রিক শ্রমিকদের নানা হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। দেশের যে কোন এলাকার তুলনায় এদের মজুরি বেশি গুদামে মাল উঠানোনামানোয়। তারপরও স্বস্তি নেই। এখানে হয় চাঁদাবাজি। ট্রাকপ্রতি আদায় করা হয় এই চাঁদা। নতুবা ট্রাকে মালবোঝাই হয় না। এই চাঁদা যে ট্রাক থেকে পাওয়া যায় সেটাতে বোঝাই করা হয়। এখানে জোরজুলুম আছে ট্রাক মালিকদের। তারা জিম্মি করে রেখেছেন এই এলাকায় পরিবহন ব্যবসা। অস্বাভাবিক ভাড়ার হার এখানে। বাইরের ট্রাক নিয়ে কেউ মাল নিয়ে যাবেন সেটাও করতে দেন না তারা। মাঝিরঘাট থেকে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাড়া যা হওয়ার কথা, তার দ্বিগুণ বা আরও বেশি ভাড়ায় ট্রাক নিতে বাধ্য করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, গুদাম মালিক, শ্রমিক এবং ট্রাক মালিকরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এভাবে মাল সরিয়ে নেয়া, চাঁদাবাজি এবং জোরজবরদস্তি করছেন।
অনেক গুদামের অবস্থা একেবারে জরাজীর্ণ। সংস্কার না হওয়ায় বৃষ্টির সময় ভিতরে পানি ঢুকে। মালামাল নষ্ট হয়। বছরে বছরে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। কিন্তু এই নিয়ে মাঝি, মালিকদের যেন কোন মাথাব্যথা নেই। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তীতে এসব গুদামকে নিরাপদ মাল রাখার উপযোগী করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তখন কিছুটা চেষ্টা হয়েছিল সংস্কারের। পরে আর তেমন কিছু হয়নি। এসব কারণে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের আমদানি পণ্য মজুদের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। বিএসএম গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ উন্নতমানের গুদাম নির্মাণ করেছেন নাসিরাবাদ, অলংকার মোড়, ফৌজদারহাট, হালিশহর, কালুরঘাটসহ অন্যান্য এলাকায়।
একসময় আমদানি বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের। ভোগ্যপণ্যসহ অন্যান্য মালামাল আমদানি করতেন তারা। আর আমদানি করা মাল রাখার জন্য সেই ব্রিটিশ আমলে সূচনা হয় গুদাম ব্যবসার। কর্ণফুলীর তীরে সদরঘাট, মাঝিরঘাট, মাদারবাড়ির স্থানে স্থানে গড়ে উঠে গুদাম। জমজমাট ছিল ব্যবসা। কিন্তু সেই রমরমা অবস্থা নেই। বছরে বছরে সীমিত হয়ে পড়ছে গুদাম ব্যবসা। অথচ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন পণ্যের আমদানিও বেড়েছে। মাল মজুদের জন্য গুদাম সুবিধার চাহিদাও বেড়ে গেছে অনেক। তাতে সদরঘাট মাঝিরঘাটের গুদাম ব্যবসাও সেভাবে বৃদ্ধির কথা। কিন্তু তা হয়নি। বহু গুদাম খালি। কোন আমদানিকারক একান্ত সমস্যায় না পড়লে এই এলাকায় তাদের মাল মজুদ রাখেন না