পূর্বকোণ ডেস্ক

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বুধবার জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত বারটায় হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম রাষ্ট্র যারা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিল। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টকে তাদের দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।
স্বভাবতই ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরায়েল সন্তুষ্ট, কিন্তু ফিলিস্তিনিরা ছাড়াও পুরো আরব বিশ্বের নেতারা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকেই নস্যাৎ করবে। এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য চরম এক উস্কানি। ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিপুল উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে করে তুলেছে আরও গভীর। আরবসহ মুসলিম বিশ্ব ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিরোধিতা করছে রাশিয়াফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশগুলোও।
এদিকে ট্রাম্পের এই স্বীকৃতির জেরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান আগামী ১৩ ডিসেম্বর ইস্তাম্বুলে ওআইসির জরুরি বৈঠক আহআন করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গত মঙ্গলবারই জানিয়েছিলেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবিসি নিউজ আভাস দিয়েছিল, দূতাবাস এখনই না সরালেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সমন্বিত জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানী ঘোষণা করতে পারেন। বুধবার ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানালেন, দূতাবাস স্থানানন্তরে সময় নিলেও জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানীর স্বীকৃতি দিতে দেরি করবেন না বিতর্কিত এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট।
ইহুদিখ্রিস্টান মুসলিম; তিন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় তীর্থস্থান জেরুজালেম।
মার্কিন দূতাবাসকে তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানানন্তর করতে ১৯৯৫ সালেই একটি আইন প্রণয়ন করে মার্কিন কংগ্রেস। তখন থেকে পর্যন্ত কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেননি। ওই আইনের বিধান অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের সামগ্রিক ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের। চাইলে তারা জাতীয় নিরাপত্তা অন্যান্য জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় প্রতি মাস পর পর স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। সেই ১৯৯৫ সাল থেকেই প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইনগত সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। ফলে তেল আবিবেই থেকে গেছে মার্কিন দূতাবাস। ট্রাম্পও দ্বিতীয়বারের মতো একই সিদ্ধান্ত নিলেন।
তেল আবিব থেকে দূতাবাস না সরিয়ে পূর্ব পশ্চিম জেরুজালেম এক করে ফেলতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। সূত্রের বরাতে এবিসি নিউজ দাবি করে, হোয়াইট হাউস এখনএকত্রিত জেরুজালেমেরপরিকল্পনা করছে। আবার এই দুইটি বিষয়ও আলাদা করে হতে পারে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন না যে ট্রাম্প কি করতে যাচ্ছেন। তবে অনেকের মতে, ওয়েভার সই করলেও দূতাবাস সরানোর পরিকল্পনা থাকবে তার। এছাড়া জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক কাজগুলো সেখানে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রদূত ফ্রাইডম্যানও বারবার এই পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সবসময়ই কাজ করছি আমরা।
জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে আবার উত্তেজনা বৃদ্ধির আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আরব লীগ ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ফিলিস্তিন ছাড়াও সৌদি আরব, আমিরাত, তুরস্ক, জর্ডান, ফ্রান্স, কাতার, মিসর, মরক্কো, কুয়েত, জার্মানি ইরাক সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়েছে।
জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনকে ফোন করেন। এসময় তিনি বলেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এটা শুধু জর্ডান বা ফিলিস্তিনের নাগরিকদের নয়, পুরো আরব মুসলিম বিশ্বের বিষয়।
কিন্তু কেন জেরুজালেম মধ্যপ্রাচ্যে এত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু?
প্রাচীন এই শহরটি ইসরায়েলিফিলিস্তিনি বিরোধের একদম কেন্দ্রে। শুধু এই শহরটি নিয়ে দশকের পর দশক ধরে থেকে থেকেই সহিংসতা হয়েছে, প্রচুর রক্তপাত হয়েছে।
বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা ইয়োল্যান্ডে নিল বলছেন, জেরুজালেমের অবস্থার যে কোনো পরিবর্তনের প্রভাব নানাবিধ এবং তা যে কোনো সময় আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে।
প্রথম কথা, ধর্মীয় দিক থেকে জেরুজালেম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি শহর। ইসলাম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনার অনেকগুলোই এই শহরে। এছাড়া, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব হয়তো এখন ধর্মীয় গুরুত্বকেও ছাপিয়ে গেছে।
ইসরায়েল বলে আসছেঅভিন্ন জেরুজালেম তাদের চিরদিনের রাজধানী।আসলে ১৮৪৮ সালে ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই ইসরায়েল জেরুজালেমের পশ্চিমাংশে দেশের সংসদ ভবন স্থাপন করে।
১৯৬৭ সালে আরবদের সাথে যুদ্ধে জিতে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমও দখল করে নেয় এবং পুরো জেরুজালেম শহরটিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে ঘোষণা করে।
অপরদিকে ফিলিস্তিনিরা কোনোদিনই পূর্ব জেরুজালেমের দখল মেনে নেয়নি। তারা সবসময় বলে আসছে পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী।
ফিলিস্তিনি নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ স্বাধীন ফিলিসিস্তন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দিয়ে দেওয়া। তাদের কথা, জেরুজালেম তাদের না থাকলে, কোনো টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কখনই সম্ভব হবেনা।
যদিও গত দশকগুলোতে পূর্ব জেরুজালেমের বহু জায়গায় ইহুদি বসতি বানিয়েছে, কিন্তু তারপরও এখানকার সিংহভাগ বাসিন্দা ফিলিস্তিনি যারা শত শত বছর ধরেই এই শহরে বসবাস করছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও মেনে নিয়েছে, জেরুজালেম শহরের মর্যাদা, মালিকানা নির্ধারিত হবে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি রফার অংশ হিসাবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে তা লিখিত আকারে রয়েছে।
ফলে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। সমস্ত বিদেশি দূতাবাস তেল আবিবে, যদিও জেরুজালেমে অনেকে দেশের কনস্যুলেট রয়েছে