নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশ নবযাত্রার পথে

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশ নবযাত্রার পথে

বহুল প্রতীক্ষিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল কাজের উদ্বোধন হলো অবশেষে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাবনা জেলার রূপপুরে দেশের এই প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের রীতি অনুযায়ী এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুতের জগতে প্রবেশ করলো। বর্তমানে পৃথিবীর ৩১টি দেশে ৪৩৭টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। মূল নির্মাণকাজ উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ৩২তম দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হলো বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে ষষ্ঠ এবং সার্কের তৃতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দেশের তালিকায় ঢুকল। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রকল্প গ্রহণের ৫৭ বছর পর রাশিয়ার সহযোগিতায় পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। উল্লেখ্য, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান আমলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই উদ্যোগের প্রেক্ষিতে ১৯৬২ হতে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পদ্মা নদীর তীরে ঈশ্বরদীর রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে দুই দফা সম্ভাব্যতা যাচাই হলেও অর্থের যোগান না থাকায় প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সুপারিশ করে। তৎকালীন পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম এ ওয়াজেদ মিঞার উপদেশনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার একশন প্লানের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু ২০০১ খ্রিস্টাব্দে বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আবারো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ স্থিমিত হয়ে যায়। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়। এর ভিত্তিতে রাশিয়ার সঙ্গে ‘সমঝোতা স্মারক’ ও ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয়। ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে রাশিয়ান ফেডারেশন ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে প্রকল্প নির্মাণে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আর গত ৩০ নভেম্বর শুরু হলেঅ এই প্রকল্পের মূল নির্মাণ পর্বের কাজ।
এই প্রকল্পে রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ‘ভিভিইআর ১২০০’ প্রযুক্তির পরমাণু চুল্লি ব্যবহার করা হবে। এই রিঅ্যাক্টর বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি রাশিয়ায় শুধুমাত্র একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে রয়েছে। বাংলাদেশের রূপপুরে এটি দ্বিতীয় ব্যবহার হবে। প্রসঙ্গত, রাশিয়ার বাইরে এই প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরেই প্রথম হচ্ছে। ঠিকাদার কোম্পানি রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয়েক্সপোর্ট এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এফসিপি উদ্বোধনের দিন হতে ৬৩ মাসের মধ্যে এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হবে। চুল্লি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হলে জাতীয় বিদ্যুৎগ্রিডে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। এতে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার এক বিরাট অংশ পূরণ হবে। তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে দেশের শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এ সময়ে এটি একটি স্বস্তির খবর নিঃসন্দেহে। আমাদের বিশ্বাস, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎপ্রকল্পের মাধ্যমে নতুন এক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পারমাণবিক শক্তি হতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। যা দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরো সচল ও মজবুত করবে। এর মাধ্যমে পূরণ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন, সহজে বাস্তবায়িত হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ভিশন-২০২১-৪১’। আমরা আশা করবো, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যদিয়ে এই প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ হবে।