আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওপেক। জোটের আওতায় পণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলন হ্রাসসংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের মার্চে। এর আগে চুক্তির মেয়াদ আরো একদফা বাড়ানো নিয়ে চলছে আলোচনা

আজ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় বসছে ওপেকের পরবর্তী বৈঠক। বৈঠক থেকে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। তবে এর আগেই ওপেকসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে চুক্তিটির মেয়াদ আরো নয় মাসের জন্য বাড়ছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
২০১৪ সালের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি সরবরাহের জেরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দরপতন শুরু হয়। একপর্যায়ে পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপর থেকে কমে ৩০ ডলারের নিচে নেমে যায়। দরপতন রোধে ওপেকভুক্ত দেশগুলো পণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলন কমাতে চুক্তি সই করে। রাশিয়াসহ ওপেকবহির্ভূত কয়েকটি দেশ চুক্তির শর্ত মেনে চলার ঘোষণা দেয়। চুক্তি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সম্মিলিত দৈনিক উত্তোলন বছরের শুরুর পর্যায় থেকে ১৮ লাখ ব্যারেল কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। পণ্যটির বৈশ্বিক মজুদ পাঁচ বছরের গড়ের সমপর্যায়ে আসবে বলেও আশা করা হয়। তবে নির্ধারিত এক বছরের মধ্যে শর্তপূরণ সম্ভব না হলে চুক্তিটির মেয়াদ আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এখন পর্যন্ত পণ্যটির দাম কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটি ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের সামান্য ওপরে বিক্রি হচ্ছে। কারণে চুক্তিটির মেয়াদ আরো একদফা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় সৌদি আরব রাশিয়া। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ৩০ নভেম্বর ওপেকের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ওপেকের চুক্তি বাস্তবায়নে সৌদি আরব রাশিয়া বরাবরই নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। এমনকি চুক্তির মেয়াদ আরো একদফা বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে দুটি দেশের পক্ষ থেকে। অন্য দেশগুলোকে রাজি করানোর বিষয়েও দুটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে চলতি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে এসে রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। রুশ সরকার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে থাকলেও দেশটির জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাশিয়ার জ্বালানি খাত। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির আরেক দফা দরপতন ঘটে। তবে বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থানে অটল রয়েছে ক্রেমলিন। গতকাল এক সাক্ষাত্কারে রুশ জ্বালানিমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক বলেন, ওপেকের চুক্তির মেয়াদ আরো একদফা বাড়লে রুশ জ্বালানি খাত কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটা ঠিক। তবে পণ্যটির বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিতে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিদ্যমান চুক্তিটির মেয়াদ কতদিন বাড়তে পারে, বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলেননি।
সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় ওপেকসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার আর এক বছর নয়, বরং নয় মাসের জন্য ওপেকের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে সৌদি আরব। সৌদি প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রস্তাব এসেছে। বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। এখন অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। ৩০ নভেম্বরের বৈঠক শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
ওপেকভুক্ত হয়েও বিদ্যমান চুক্তিটির আওতার বাইরে ছিল আফ্রিকার দেশ লিবিয়া নাইজেরিয়া। দীর্ঘদিন অচলাবস্থা বজায় থাকায় দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্বার্থে দেশ দুটিকে চুক্তির বাইরে রাখা হয়। তবে চুক্তির ক্ষেত্রে এটিকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন বিশ্লেষকরা। বিগত এক বছরে লিবিয়া নাইজেরিয়াকে চুক্তির আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও দেশ দুটি চুক্তিভুক্ত হয়নি। আসন্ন বৈঠকে বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। গতকাল লিবিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মেদ তাহের সিয়ালা চুক্তিভুক্ত হওয়ার বিষয়ে দেশটির ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের কাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধির জন্য আসন্ন বৈঠকে ওপেকের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে সমর্থন দেবে লিবিয়া। সব পক্ষের জন্য যৌক্তিক হলে অবশ্যই চুক্তিটির মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানো হবে। চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আমরা (লিবিয়া সরকার) সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করব। তাহের সিয়ালার এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ওপেকের আসন্ন বৈঠকেই লিবিয়ার চুক্তিভুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
[সূত্র : রয়টার্স, পত্রপত্রিকা]
নাসরিন আকতার