প্র তি বে দ ন

মানুষের খাদ্যতালিকায় ভুট্টা তার স্থান করে নিয়েছিল প্রায় সাত হাজার বছর আগে বাংলাদেশের মাঠে ভুট্টা গাছ আর এর দানাসমৃদ্ধ হলদে মোচার দাপট দেখে বোঝা মুশকিল, এর জন্ম সুদূর মেক্সিকোয়। দেশের জলহাওয়ামৃত্তিকায় চমত্কার মানিয়ে নিয়েছে ভুট্টা

দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখায় এখন বড় এক নিয়ামক ভুট্টা। আগে এটিকে মাইনর শস্য হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন জাতীয় আয়ের হিসাব নির্ধারণে এটিকে মেজর বা প্রধান শস্য হিসেবে গণ্য করা হয়। কৃষি খাতের জিডিপি গণনায় বিবেচিত ১২৮টি ফসলের মধ্যে আগে প্রধান শস্য হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হতো গম, পাট, আলু, আউশ, আমন বোরো ধানকে। এখন এর সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ভুট্টা।
গত এক দশকে দেশে হাইব্রিড ভুট্টার আবাদি এলাকা, উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দানাদার খাদ্যশস্যের মধ্যে হেক্টরপ্রতি ফলনের দিক থেকে ভুট্টার স্থান প্রথম সারিতেই। যদিও আবাদি এলাকা মোট উৎপাদনের দিক থেকে এটি এখন ধান গমের পর তৃতীয় স্থানে। ২০০২০৩ সালে দেশে মোট ভুট্টার উৎপাদন ছিল মাত্র লাখ ৭৫ হাজার টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ টনে।
দেশে শস্যটির আবাদে সুবিধা পাওয়া যায় তুলনামূলক বেশি। এর ভেষজ গুণও রয়েছে অনেক। ধান গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান বেশি। এতে প্রায় ১১ শতাংশ আমিষজাতীয় উপাদান রয়েছে। আমিষে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, ট্রিপটোফ্যান লাইসিন রয়েছে অধিক পরিমাণে। এছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম হলদে রঙের ভুট্টা দানায় প্রায় ৯০ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন বা ভিটামিন থাকে। বর্তমানে শস্যটির গাছ সবুজ পাতা উন্নত মানের গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হাঁসমুরগি মাছের খাদ্য হিসেবেও এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছ। শুধু পশু, মুরগির খামার মাছের চাহিদা মেটানোর জন্যই প্রতি বছর এর চাহিদা বাড়ছে।
টেকসই খাদ্য পুষ্টিনিরাপত্তা বিবেচনায় ভাতের সম্পূরক হিসেবে সাদা ভুট্টাজাত খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। চালগমের পাশাপাশি সাদা ভুট্টার ব্যবহার ব্যাপক হারে চালু হলে খাদ্য পুষ্টিনিরাপত্তা জোরদার হবে। ভাতের ওপরও চাপ কমবে। কমবে গম আমদানির পরিমাণও। সাদা ভুট্টা থেকে পরোটা, নান রুটি, পিঁয়াজু, সবজি পাকোড়া, চিকেন রোল, শর্মা, মিষ্টি তেল পিঠা, কেক, পাস্তা, জিলাপি, কর্ন সুপসহ বিভিন্ন খাবার তৈরি করা হয়।
বেলেদোআঁশ দোআঁশ মাটি ভুট্টা চাষের জন্য উপযোগী। এক দশক আগে ২০০৫০৬ অর্থবছরেও দেশে ভুট্টার আবাদ হয়েছিল মাত্র এক লাখ হেক্টর জমিতে। এক দশকের ব্যবধানে ২০১৫১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় লাখ ৩৫ হাজার হেক্টরে। আবাদ এলাকা প্রায় আড়াই গুণ বাড়লেও উৎপাদন বেড়েছে তার চেয়ে বেশি হারে। ২০০৫০৬ অর্থবছরে দেশে ভুট্টার মোট উৎপাদন ছিল লাখ ২১ হাজার টন। ২০১৫১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৪৫ হাজার টনে। সময়ে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে। আগে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন পাঁচছয় টনে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা বেড়ে সাতআট টনে দাঁড়িয়েছে, যা দেশে উৎপাদিত অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে বেশি। উৎপাদনশীলতা কৃষকের আগ্রহ বাড়ার কারণেই দেশে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে।
উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের ভুট্টা উৎপাদন এখন বৈশ্বিক গড়ের তুলনায়ও এগিয়ে। বর্তমানে ভুট্টার বৈশ্বিক হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন দশমিক ১২ টন, যেখানে বাংলাদেশে এর গড় দশমিক ৯৮ টন। উৎপাদনশীলতায় এখন বাংলাদেশের ওপরের অবস্থানে রয়েছে শুধু যুক্তরাষ্ট্র।
জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, ভুট্টার উৎপানশীলতায় বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ব্রাজিল। দেশ তিনটিতে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা যথাক্রমে দশমিক ৬১, দশমিক ৩৫ দশমিক ৭১ টন। অন্যদিকে বৈশ্বিক উৎপাদনশীলতায় শীর্ষস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে শস্যটির হেক্টরপ্রতি ফলন ১০ দশমিক ৩৪ টন। প্রতিবেশী ভারতে এর উৎপাদনশীলতা মাত্র দশমিক শূন্য টন। এছাড়া মেক্সিকোয় দশমিক ৮১ জাপানে দশমিক টন। দেশের জমির উর্বরাশক্তি, অনুকূল আবহাওয়া সরকারের সহায়ক নীতির কারণে দেশে ভুট্টার বাড়তি উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা গেছে।
দেশে উৎপাদিত ভুট্টার বেশির ভাগই ব্যবহার হচ্ছে পোলট্রি মাছের খাদ্য তৈরিতে। পোলট্রি শিল্পের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ১২১৪ লাখ টন এবং ফিশারিজ ফিডমিলগুলোর বার্ষিক চাহিদা প্রায় তিনচার লাখ টন। এর বাইরে বীজ তৈরি ছাড়াও গমের সঙ্গে ভুট্টার মিশ্রণ কৃষক পর্যায়ে নিজেদের ব্যবহারে প্রয়োজন হচ্ছে আরো দুতিন লাখ টন। তবে চাহিদার বেশি উৎপাদন হওয়ায় সম্প্রতি বাংলাদেশ মেইজ অ্যাসোসিয়েশনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে পণ্যটি রফতানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দেশে পণ্যটির বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে এর দাম নির্ধারণ করা হয় বিশ্ববাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে।
বাংলাদেশে ভুট্টা আবাদে ব্যবহৃত হাইব্রিড জাতগুলোর মূল উৎস দুটি। আমদানি করা জাতই এখানে ভুট্টাবীজের প্রধান উৎস। অন্য উৎস হলো বাংলাদেশে উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাত। ভুট্টা হলো দেশের একমাত্র ফসল, যার প্রতিটি জাতই এখন হাইব্রিড। অর্থাৎ দেশে ভুট্টা আবাদের শতভাগই দখল করে রয়েছে হাইব্রিড জাত।
কৃষকদের কাছে বিদেশী জাতের চাহিদা বেশি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত. বিদেশী জাতগুলোর ভুট্টা গাছে মোচা তৈরি হয় দুতিনটি, যেখানে দেশে উদ্ভাবিত জাতগুলোয় এর সংখ্যা একদুটি। ভুট্টা গাছে মোচার সংখ্যা বেশি হলে মোচা ছোট হয় দানার পরিমাণ কম হয়। তবে তিন মোচার ভুট্টা গাছে ফলন দুই মোচার গাছ অপেক্ষা কিছুটা বেশি। এছাড়া বিদেশী জাতের বীজ পাওয়া তুলনামূলক সহজ। বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী জাতের বীজ চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। দেশী জাতের বীজ এতটা সুলভ নয়। তাছাড়া নিয়ে প্রচারপ্রচারণাও বেশি নেই। বিদেশী কোনো কোনো হাইব্রিড জাতের ভুট্টার ফলন দেশী হাইব্রিডের তুলনায় বেশি।
বিদেশী জাতগুলোর মধ্যে অঞ্চলভেদে কোনো কোনো জাতের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে এনকে৪০, এনকে৪৬, এনকে৪৮, এনকে৬০, প্যাসিফিক১১, প্যাসিফিক৬০, ৯০০ এম, কনক, ৭১৭ বারি ভুট্টা৫। এছাড়া এলিট, সানশাইন, উত্তরণ , ৯০০ এম, ৯০০ এম গোল্ড, সিপি ৮০৮, মিরাকল, সুপার, পাইনাল, টাইটান, ডেনালি, ৯৮৭কে পাইওনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর বাইরেও ভালো কিছু জাতের ভুট্টার বীজ পাওয়া যায়। নতুন নতুন জাতও আসছে অনেক।
বারি হাইব্রিড ভুট্টা জাতটির উন্নয়ন করা হয়েছে থাইল্যান্ড থেকে সংগৃহীত ইনব্রিড থেকে বাছাইয়ের মাধ্যমে। জীবত্কাল রবি মৌসুমে ১৩৫১৪৫ খরিফ মৌসুমে ৯৫১০৫ দিন। জাতের গাছের উচ্চতা ১৯০২১০ সেন্টিমিটার। প্রতি হাজার দানার ওজন ৫৭০৫৮০ গ্রাম। জাতটির ফলন হেক্টরপ্রতি আট থেকে সাড়ে আট টন। [সূত্র : পত্রপত্রিকা]
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য) রাকিবুল হক