নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » সড়ক-উন্নয়ন কর্ম ও দূষণজনিত মৃত্যু

সড়ক-উন্নয়ন কর্ম ও দূষণজনিত মৃত্যু

পরিবেশ আইন না মেনে উন্নয়ন কর্মকাপরিচালনা এবং রাস্তাঘাটের সংস্কার কাজে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এবং সড়ক জনপথ বিভাগ (সওজ) এর খামখেয়ালি যথাকায়দায় ভাঙাচোরা সড়কের মেরামত না হওয়ায় নগরীতে বায়ুদূষণ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নগরীর অধিকাংশ এলাকা সারাদিনই ঢাকা থাকে ধূলির চাদরে। এতে জনস্বাস্থ্য পড়ছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। চলাফেরায় সময় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বায়ুদূষণজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী। অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, চট্টগ্রাম মহানগরী কি বসবাসের অযোগ্য হতে যাচ্ছে? দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এমন চিত্র পীড়াদায়ক বলতে হবে। চট্টগ্রাম মহানগরীর এমন চিত্র সরকারের উন্নয়নের দাবিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
দৈনিক পূর্বকোণে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো বলছে, নগরীর প্রায় সব রাস্তাঘাট অলিগলির দুরবস্থা এখন অবর্ণনীয় রূপ ধারণ করেছে। যানবাহন চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে ভাঙাচোরা খানাখন্দময় সড়কগুলো। দুষ্কর হয়ে পড়েছে এসব সড়কে নগরবাসীর স্বাভাবিক হাঁটাচলাও। বড় বড় গর্ত আর খানাখন্দে ভরা নগরীর রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত ঝুঁঁকি নিয়ে চলছে ছোট বড় যানবাহন। ফলে জনভোগান্তির পাশাপাশি নানা দুর্ঘটনাও পিছু ছাড়ছে না নগরবাসীর। রাস্তার অবস্থা বেহাল থাকায় প্রায়ই ঘটছে ছোটবড় দুর্ঘটনা। চসিকের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে কিছু মেরামত উদ্যোগ দেখা গেলেও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অত্যধিক বিধ্বস্ত, নাজুক সড়কগুলোতে জরুরিভিত্তিতে বিক্ষিপ্তভাবে খানাখন্দে কিছু ইটসুরকি বালি ফেলে জোড়াতালির মেরামতের উদ্যোগ নিলেও যথাযথ নিয়মিতভাবে না হওয়ার কারণে সুফল মিলছে না। তাছাড়া চসিক মেয়র বলেছিলেন বর্ষা কাটলেই টেকসই সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এখনও সে কথার বাস্তবায়ন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার খোলে দেওয়া হলেও ফ্লাইওভারের নিচের সড়কের সংস্কার কাজে হাত দেওয়া হয়নি। কাজটি চসিক করবে, নাকি চউক করবে, তা নিয়েও চলছে বিতর্ক।
সড়ক জনপথ বিভাগের আওতাধীন সড়কের অবস্থাও কাহিল। ওয়াসাসহ নানা সংস্থার উন্নয়ন কাজে সমন্বয় না থাকার কারণে বছরব্যাপী চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। এতে রাস্তাগুলো যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। পায়ে হেঁটে চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টিতে কাদা আর রোদে ধূলার চাদরে ঢেকে যায় পুরো এলাকা। বৃষ্টির সময় সড়কে পানি জমে কাদায় ভরে যায়। আর রোদে এই কাদা শুকিয়ে ধুলোয় একাকার হয়ে পড়ে। শ্বাসপ্রশ্বাসে সে ধুলি ফুসফুসে ঢুকে জন্ম দিচ্ছে নানা জটিল ব্যাধির। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ সংস্কারে যথাযথ মান বজায় না রাখা এবং সমন্বহীনভাবে বিভিন্ন সেবা সংস্থার খোঁড়াখুড়ির পরিণামেই সড়কগুলো বেহাল রূপ ধারন করেছে। যথাযথ মান বজায় রেখে সংস্কার কাজ হলে এবং যেসব সেবা সংস্থা তাদের অবকাঠামো মেরামত বা সম্প্রসারণের প্রয়োজনে রাস্তাগুলো খুঁড়ছে, তাদের কাজে সমন্বয় থাকলে খোঁড়া জায়গাগুলোতে দায়সারাভাবে মাটিচাপা না দিয়ে পুনর্মেরামত করলে এবং বর্ষায় তাদের কাজের উৎসাহ না বাড়লে সড়কগুলোর এমন ন্যাক্কারজনক চিত্র দেখতে হতো না। একইসঙ্গে পরিবেশ আইন মেনে উন্নয়ন কাজ করলে বায়ুদূষণও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছতো না।
উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্বাস্থ্য সাময়িকীদ্য ল্যানসেটকয়েক দিন আগে পরিবেশদূষণজনিত মৃত্যু নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।দ্য ল্যানসেট কমিশন অন পলিউশন অ্যান্ড হেলথএই গবেষণাটি করেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবছর পরিবেশদূষণের কারণে ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ৯২ শতাংশই মারা যায় দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। এই মৃত্যুর মিছিলে থাকা শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান সবার উপরে। বিশ্বে ছয়টি মৃত্যুর একটির জন্য দায়ী দূষণ। আর বাংলাদেশে দূষণের কারণে প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ বায়ু দূষণ, তার পরেই রয়েছে পানি দূষণ। দুঃখজনক ব্যাপারটি হচ্ছে, দূষণ রোধে কোনো উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়। ফলে দূষণের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
আমরা মনে করি, চট্টগ্রাম মহানগরীর সড়কের দুরবস্থার অবসান, বায়ুদূষণ রোধ এবং পরিবেশ আইন মেনে উন্নয়ন কাজ পরিচালনার বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নানা অজুহাতে দায় এড়ালে প্রাণহানিসহ নগরবাসীর দৃশ্যমান দুর্ভোগের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিরও বিপুল ক্ষতি হবে। দুর্ভোগচিত্রের অবসানে দ্রুত সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। বিষয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা না করে এখনই স্বল্প দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নিতে হবে। দূষণ রোধে সরকারের যুৎসই কর্মসূচি থাকতে হবে। যে কোনো উন্নয়ণ কর্মকা পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে