জাহাজ ভাঙার গোড়ার কথা …….. ষাটের গোড়ার দিকে এক সামুদ্রিক ঝড়ে জলোচ্ছ্বাসে অতিদূর সমুদ্রে হাল ভেঙে একদা এক নাবিক হারিয়েছিলো পথের দিশা। সেই নাবিকের জাহাজ এসে ভিড়েছিলো ফৌজদারহাটের সমুদ্র সৈকতে। সেই গ্রীক জাহাজটি আর সমুদ্রে ভাসানো সম্ভব হয় নি। দীর্ঘদিন এই জাহাজ কাত হয়ে পড়েছিলো সৈকতে। সেই জাহাজ পরে ১৯৬৪তে স্ক্র্যাপ হিসেবে ভাঙার দায়িত্ব নিয়োছিলো স্টিল হাউসের স্বত্বাধিকারী শফি ভাই, হাতেম ভাই, জুনু ভাই সুজা ভাই ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।
সমুদ্র দর্শনে এক সময় এই ফৌজদারহাট সৈকতে দলবেঁধে ছুটে আসতো বিকেল ভ্রমণে বন্দর নগরীর কোলাহল মুখরতাকে পেছেনে ফেলে পরিবারপরিবার পরিজন, বন্ধুবান্ধব, প্রিয়প্রিয়া সবাই। এখন এরা কেউ এখানে আসে না। ছুটে যায় পতেঙ্গার সৈকতে। ছোট্ট ঝুপড়ির টিস্টলগুলোও আর নেই। এখানে এখন এসে ভিড় করে সকালসন্ধ্যা গভীর রাত অবধি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যবসায়ীরা আর গ্যাস ফিল্ডে কর্মরত দেশীবিদেশীরা।
তার সাথে সম্প্রতি কয়েক বছরের যুক্ত হয়েছে গ্যাস তৈল কোম্পানীসমূহ। সোনার হরিণের সন্ধানে নতুন নতুন আরো সংস্থা এই এলাকায় প্রবেশ করছে। এই এলাকার ভবিষ্যৎ কি, এই এলাকার জনগণের নিরাপত্তা কি, পরিবেশের ব্যাপারে সরকারের সংশিষ্ট বিভাগের ভাবনা কি ? অসংগঠিত জনগণ হয়তো সাময়িক লাভের কথা ভাবছে, একদিন কি তাদের উচ্ছেদ হয়ে যেতে হবে নিজেদের পারিবারিক ভিটেমাটি থেকেএসব নিয়ে ভাবনার যা কিছু সময় এখনই। সিলেটের গ্যাস ফিল্ডের দুর্ঘটনার ক্ষত এখনো আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যায় নি।
জাহাজ ভাঙার ব্যবসা ……..
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত পাকিস্তানী জাহাজআল আব্বাসকে চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে ডুবন্ত অবস্থা থেকে সোভিয়েত জাহাজ উদ্ধারকারীদল উদ্ধার করে ফৌজদারহাটের সৈকতে নিয়ে আসে। ১৯৭৪ এই জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে ক্রয় করে কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কসপ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এবং একই সময়ে এই জাহাজ ভাঙার ব্যবসা শুরু হয়। দুশশ্রমিক এই জাহাজ ভাঙার কাজে কাজে অংশগ্রহণ করে। এইসব শ্রমিকের মোটেই কাজে অভিজ্ঞতা ছিল না। পরবর্তীতেও এই কাজে অনাভিজ্ঞতার কারণে এই জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় নানা কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহত হচ্ছে। গড়ে উঠেনি জাহাজ কাটার আধুনিক কোনো ব্যবস্থা। এরপর যারাই এই ব্যবসায় এসেছে তারা কেউ আর পেছন ফিরে তাকান নি।
মাছ পাওয়া না পাওয়ার কথা ……… পতেঙ্গা থেকে সীতাকুপর্যন্ত এই দীর্ঘ উপকূলে জেলে সম্প্রদায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু এখন আর এই এলাকায় খুব একটা মাছ পাওয়া যাচ্ছে না পরিবেশ দূষণের কারণে। এমন কি ইলিশ মৌসুমে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না কয়েক মৌসুম ধরে। খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে হচ্ছে জেলেদের প্রতিদিন। অথচ, এই মৌসুমের দিকে সারা বছর তাকিয়ে থাকে। মাছ নাপাওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের মতামত, এই উপকূলের সলিমপুর, লতিফপুর, শীতলপুর, কুমিরা, ভাটিয়ারী এলাকায় গড়ে উঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প মূলত এর জন্য দায়ী। জাহাজ ভাঙার সময় জাহাজের বিষাক্ত বর্জ্য মিশ্রিত তেলসহ অন্যান্য তৈলাক্ত পর্দাথ দ্রব্য সমুদ্রে পড়ে পানির সাথে মিশে পরিবেশ দূষিত করে তুলছে। পানি দূষিত হওয়ায় মাছ এলাকা থেকে সরে গেছে, ফলে ইলিশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, শুধু ইলিশ মাছ নয় অন্যান্য মাছও এখন এলাকায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। জাহাজ কাটার সময় জাহাজের অপরিশোধিত তেল রাসায়নিক বিভিন্ন বর্জ্য উপকূলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে উপকূল সমুদ্র আজ মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি। সমুদ্রের পাড় ভাঙছে, লোকালয়ে গাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছেএসব নিয়ে ভাববার এবং এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট মতামত দেয়ার সময়ও এখন এসেছে।
গ্যাস ফিল্ড পরিবেশ ………. জাহাজভাঙা শিল্পের সাথে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে গড়ে উঠা গ্যাস ফিল্ডের কারণেও সমুদ্র দূষণ হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। এই গ্যাস ফিল্ডের দিকটাও মাছ নাপাওয়ার আর একটি প্রধান কারন কি না তাও অতিসত্বর তদন্ত বা গবেষণা করে দেখা দরকার।
এখানে প্রবেশ করছে আর কয়েকটি গ্যাস কোম্পানী। এই এলাকার সমূহ ক্ষতির আগে এসব নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। সচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে এই এলাকার জনগণের মাঝে। এর জন্য চাই পরিবেশবিদদের অগ্রণী ভূমিকা এবং গণ মাধ্যমে বা সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
পুনশ্চ : পরিবেশ বিল …….. বার বার সংসদে বেশ কয়েকবার পরিবেশর প্রসঙ্গটি উঠে আসে। পরিবেশ সংক্রান্ত কয়েকটি বিলও উত্থাপিত হয়। পরিবেশ বনমন্ত্রী সংসদে পরিবেশ সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করেন। বিলগুলো হলো : পরিবেশ আদালত বিল, দ্য ফরেস্ট (সংশোধন) বিল বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) বিল।
পরিবেশ আদালত বিলে পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশের মান উন্নয়ন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রশমনের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে বর্ণিত অপরাধসমূহ বিচারের জন্য একটি বিশেষ আদালত গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
কিন্তু, দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা চাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং শাস্তি। আইনের প্রয়োগ নাই বলে বড় অপরাধের খুব একটা শাস্তি হয় না