মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রভাবশালী দেশ ইরান সৌদি আরব। দেশ দুটি আয়তনে যেমন বড় তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। দুটি দেশের রয়েছে ইসলামী ঐহিত্য পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার আকাক্সক্ষা। আবার দুটি দেশের মধ্যে রয়েছে বিপরীতমুখী সাদৃশ্য। ইরান হচ্ছে শিয়া প্রধান মুসলিম দেশ। যে দেশের ৯০ ভাগ হচ্ছে শিয়া আর ভাগ হচ্ছে সুন্নি জনগোষ্ঠী। অন্যদিকে সৌদি আরব হচ্ছে একটি সুন্নি প্রধান দেশ যার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ হচ্ছে সুন্নি আর ১০ ভাগ হচ্ছে শিয়া মুসলমান।
২০১০ সালে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে গণবিপ¦বের ঢেউ বয়ে যায় তার হাত থেকে বেঁচে যায় দুই সরকার প্রধানবাহরাইনের আলে খলিফা এবং সিরিয়ার আসাদ। এসময় বাহরাইনের আলে খলিফা সরকারের পতন ঠেকাতে সেখানে সৈন্য পাঠায় সৌদি আরব। আর সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঠেকাতে সেখানে হিজবুল্লাহ পাশাপাশি সামরিক পর্যবেক্ষক পাঠায় ইরান। আর এভাবে আরব বসন্তে সৌদি সহায়তায় যেমন আলে খলিফার সরকার ঠিক তেমনি হিজবুল্লাহ, ইরান রাশিয়ার সহায়তায় পতনের মুখ থেকে ফিরে এখনো পর্যন্ত ঠিকে আছে সিরিয়ার আসাদ সরকার। সিরিয়ায় সহিংসতা উস্কে দেওয়ার জন্য সৌদি, কাতার, তুরস্ক আমেরিকার পাশাপাশি পাশ্চাত্যকে দায়ী করে ইরান। অনুরূপভাবে বাহরাইন সৌদি আরবের কাতিফে সহিংসতার জন্য ইরানকে দায়ী করে সৌদি আরব।
২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি বাদশাহ আব্দুল্লাহ মৃত্যুর পর সৌদি সিংহাসনে বসেন বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ। যুবরাজের পদে আসেন মুকরিন বিন আব্দুল আজিজ। কিন্তু এর মধ্যেই ইয়েমেনে আরব বসন্তের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। হুতিরা ইরানের মদদপুষ্ট হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তা মেনে নিতে পারেনি সৌদি আরব। জাতিসংঘ সমর্থিত প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মনসুর হাদির সাহায্য আবেদনের দোহাই দিয়ে মূলত ইরানকে শায়েস্তা করতে ২৬ মার্চ ২০১৫তে সৌদি আরব ইয়েমেনে বিমান হামলা শুরু করে। অর্থাৎ বাদশাহ সালমান ক্ষমতা নেওয়ার পর সৌদি আরব আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে। ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে বাদশা ক্রাউন প্রিন্স মুকরিনকে সরিয়ে দেন যেহেতু তিনি ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত মায়ের সন্তান ছিলেন। ক্রাউন প্রিন্স মুকরিনকে সরিয়ে বাদশাহ নিজের ভাইপো বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্স করেন এবং নিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে করেন ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স যার বয়স মাত্র ৩২। কয়েক মাস আগে অসুস্থতার অজুহাতে নায়েফকে সরিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেন। যদিও ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স থাকাকালীন ভিশন ২০৩০ ঘোষণাসহ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে মোহাম্মদ বিন সালমানকেই বেশি সক্রিয় দেখা গেছে।
এরমধ্যে ২০১৫ সালের হজ মৌসুমে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করতে যাওয়ার সময় পদদলিত হয়ে ইরানের শতাধিক হাজিসহ সারা বিশ্বের হাজারের মত হাজি নিহত হন। ইরান এসময় হজে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলে এবং হজ ব্যবস্থাপনায় মুসলিম দেশগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণের দাবি জানায়। যা সৌদি আরবকে ক্ষুব্ধ করে। এনিয়ে পরের বছর ইরান নিরাপত্তার দাবিতে হজযাত্রীদের সৌদিতে পাঠায়নি। নিত্য নতুন টানাপোড়েনের ভেতরেই ২০১৬ সালে জানুয়ারি বিখ্যাত সৌদি শিয়া আলেম নিমর আন নিমরকে অন্য আরো ৪৬ জনের সাথে ফাঁসি দিলে ফুঁসে ওঠে পুরো ইরান। তেহরানে সৌদি দূতাবাস মাসহাদ কনসুলেটে হামলা চালায় ক্ষদ্ধ ইরানিরা। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে নিরাপত্তার অজুহাতে। সৌদির আবেদনে সাড়া দিয়ে আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, মিশর, সুদান ইরান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয়।
অন্যদিকে ইরানের কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সময় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালের আগস্ট সংস্কারপন্থী হাসান রৌহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে পাশ্চাত্যের সাথে ইরানের বরফ গলতে শুরু করে। পরবর্তীতে দীর্ঘসময় আলাপ আলোচনার পর ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ইরানের সাথে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য জার্মানির অর্থ্যাৎ ( পি৫ +) মধ্যে জেসিপিওএ স্বাক্ষরিত হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ ইরানের উপর থেকে পরমাণু সংশ্লিষ্ট সকল অবরোধ প্রত্যাহার করা হয় এবং ইরান তার পরমাণু কর্মসূচিতে কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে দেয়। এতে ইরান তার আটক করা শত বিলিয়ন ডলারের সম্পদে প্রবেশাধিকারের সুযোগ পায় এবং পাশাপাশি সীমিত হয়ে যাওয়া তেল রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর সুযোগ পায়। যেটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে সৌদি আরবের পাশাপাশি ইসরাইলের। কারণ ইসরাইল শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা করে আরো বেশি ইরানের উপর অবরোধ আরোপের দাবি জানায়।
আরব বসন্তের সুযোগে নিয়ে সিরিয়া ইরাকের বৃহৎ অংশ দখল করে নিজেদের রাষ্ট্র ঘোষণা করে আইএস বা ইসলামিক স্টেট। তারা সেখানে বর্বর শাসন চালু করে।
ইরান কোণঠাসা অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে সিরিয়া ইরাকে আইএসবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণ করে। ইরাকে হাসদ আস শাবি নামক মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে ইরান যেটি ইরাকের ভূখআইএস থেকে উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনুরূপভাবে সিরিয়ায় ২০১৩ সালের শেষের দিকে যেখানে আসাদ পতনের দারপ্রান্তে পোঁছে গিয়েছিলেন সেখানে প্রথমে হেজবুল্লাহ, পরে ইরান রাশিয়ার সহায়তায় আসাদ বর্তমানে তার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।
মূলত: ইরানের ভূমিকার কারণেই সৌদি আরবসহ সুন্নী দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেও ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি বাশার আল আসাদকে। পারেনি ইরাক সরকারের উপর ইরানের প্রভাব খর্ব করতে। পাশাপাশি লেবাননে হেজবুল্লাহর কারণে সৌদি আরব তার প্রভাব বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এসবের পাশাপাশি ঘরের পাশে ইয়েমেনে হুতিদের উত্থানে শঙ্কিত হয়ে পড়ে রিয়াদ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে হুতিদের স্তব্দ করে দেওয়ার আশা করলেও রাজধানী
সানাসহ জনবহুল এলাকাগুলো এখনো হুতিদের দখলে রয়েছে। এই তিন বছরে সৌদি জোট বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের অভিমত, হুতিরা গৃহযুদ্ধের আগের চেয়ে এখন আরো অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইসলামী দেশগুলোকে নিয়ে সৌদি আরব ইসলামী মিলিটারি এলায়েন্স (আইএমএ) নামক সামরিক জোট গঠন করে। ৩৪ দেশ নিয়ে এটি গঠিত হলেও পরবর্তীতে এটি ৩৭ দেশের একটি জোটে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও জোটের কার্যকর কোন প্রয়োগ পর্যন্ত দেখা যায়নি। যে দেশগুলোকে নিয়ে সৌদি আরব জোটের ঘোষণা দেয় তার অনেকগুলো পরবর্তীতে তা অস্বীকার করে। কার্যত তা আরেকটিঅকার্যকর সৌদি উদ্যোগেপরিণত হয়।
গত নভেম্বর একসাথে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে রিয়াদে। এদিন সংবাদ মাধ্যমে খবর আসে ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবারের মত হুতিরা রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি বাহিনী সেটি ভূপাতিত করেছে। সৌদি আরব এই ক্ষেপণাস্ত্র ইরান সরবরাহ করেছে বলে দাবি করে জানায় এটি যুদ্ধ ঘোষণার সামিল।
এদিকে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি এক টেলিভিশন ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার জীবনের শঙ্কা প্রকাশ করে আরব দেশগুলোতে হস্তক্ষেপের জন্য ইরান হেজবুল্লাহকে দায়ী করেন।
আবার ঐদিন রাতেই দুর্নীতির দায়ে সৌদি সরকারের নবগঠিত দুর্নীতি দমন পরিষদ ১১ যুবরাজ, মন্ত্রী এবং ডজনেরও বেশি সাবেক মন্ত্রীসহ অনেককে আটক করে। পাশাপাশি বাদশাহ বরখাস্ত করেছেন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকেও।
আর কয়েক ঘণ্টা আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রধান করে দুর্নীতি দমন পরিষদ গঠন করা হয়। বলা হচ্ছেদুর্নীতি দমনে চেয়েনিজের ক্ষমতা সুসংহতকরতেই এসব করছেন যুবরাজ। এরমধ্যে ইয়েমেন সীমান্তে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে মারা গেছেন সাবেক যুবরাজ মুকরিনের ছেলে। ইতোমধ্যেই কানাঘুঁষা শুরু হয়েছে বাদশাহ সালমান তার ছেলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকে বিশেষ করে আধুনিক বিমানের দিক থেকে সৌদি আরব ইরানের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। সৌদি প্রতিরক্ষা বাজেট ইরানের গুণেরও বেশি। আবার অন্যদিকে কৌশলগত দিক থেকে ইরান প্রতিরক্ষায় সৌদি আরবের থেকে অনেক এগিয়ে। যেটা প্রতিফলিত গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ্যাংকিংয়ে। যেখানে ১৩৩ দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান ২১তম অন্যদিকে সৌদি অবস্থান ২৪। ইরান প্রতিরক্ষাশিল্পে বিভিন্ন উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। যেখানে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা পুরোপুরি বিদেশ নির্ভর।
এখানেই সৌদির চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে আছে ইরান।
[সূত্র : রয়টার্স]