বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজপুত্র সৌদি মন্ত্রীদের সেখানে দেখা যায়নি। হারিরির ঘনিষ্ট লেবাননের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সরকারি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আলজাজিরা তথ্য জানিয়েছে।
নভেম্বর হারিরির মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। কারো সঙ্গে তাকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। পরের দিন পদত্যাগ করতে তাকে বাধ্য করা হয় (!) সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বিবৃতিতে তার পদত্যাগের খবর জানানো হয়।
ঘটনার পরম্পরা লেবাননকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। সৌদি আরবের সুন্নি রাজত্ব প্রতিদ্বন্দ্বী শিয়া ইরানের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে প্রকাশ্যে আসছে। শিয়াসুন্নি যুদ্ধের আশঙ্কা চড়াও হচ্ছে। ইরাক, সিরিয়া ইয়েমেনে সংঘর্ষ জমিয়ে তুলেছে চির প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ইরান।
তিন দেশে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে রিয়াদ তেহরান। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আলআসাদের পক্ষে ইরান কিন্তু বাশারবিরোধী বিদ্রোহীদের পক্ষে সৌদি আরব। ইরাকে কৌশলগত অবস্থান নিয়ে সৌদি আরবের বিপরীতে কখনো সরকার কখনোবা বিরোধীদের সমর্থন দিচ্ছে ইরান। আর ইয়েমেনে বলতে গেলে সরাসরি বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে দুই দেশ।
শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন করছে তেহরান আর
সুন্নিপন্থি সরকারের পক্ষ নিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করছে সৌদি আরব তাদের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।
মধ্যপ্রাচ্যে শিয়াসুন্নি ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে বিদ্যমান বৈরিতার মঞ্চে এবার টেনে আনা হচ্ছে লেবাননকে। সাদ হারিরিকে সৌদি আরবে আটকে (!) রাখার মধ্য দিয়ে যার সূত্রপাত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব চেষ্টা করছে লেবাননে ইরানসমর্থিত বড় রাজনৈতিক দল শিয়াপন্থি হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীকে দুর্বল করতে। কিন্তু তা পারেনি। লেবাননের সুন্নি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের শক্তিশালী শরিক হিজবুল্লাহ।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সাদ হারিরির ঘনিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে বিরোধিতায় না যাওয়ায় তাদের প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরবে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। ২০০৫ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন সাদ হারিরির বাবা রফিক হারিরি।
লেবাননের বেশ কিছু সূত্র দাবি করেছে, লেবাননের শীর্ষ সুন্নি রাজনীতিক হিসেবে সাদ
হারিরির পরিবর্তে তার বড় ভাই বাহা হারিরিকে ক্ষমতায় আনতে চায় সৌদি আরব। তবে বাহা এখন কোথায় আছেন, তার সঠিক তথ্য নেই। ধারণা করা হচ্ছে, তিনিও সৌদি আরব আছেন। হারিরি পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব গিয়ে বাহার প্রতি সমর্থন দিতে বলেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ কিন্তু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
হারিরির ঘনিষ্ট এক সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সে বলা হয়, ‘যখন হারিরির বিমান রিয়াদে অবতরণ করে, তার পরপরই তিনি বুঝতে পারেন, কিছু না কিছু সমস্যা আছে।ওই সূত্র আরো দাবি করে, ‘তার জন্য সেখানে কেউ অপেক্ষায় ছিলেন না।
হারিরিকে জোর করে পদত্যাগ করানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সৌদি আরব দাবি করেছে, তিনি মুক্ত। তবে বিমান থেকে নামার পর তার মুঠোফোন সত্যিই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল কিনা অথবা তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সৌদি আরব অন্য কাউকে বসাতে চাইছে কিনা, সে বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, পদত্যাগ করার পর থেকে পর্যন্ত কোনো কথা বলেননি সাদ এবং কবে নাগাদ তিনি লেবাননে ফিরবেন, তাও জানা যায়নি।
নভেম্বর সৌদি সরকার সাদ হারিরিকে ফোন করে সৌদি বাদশা সালমানের সঙ্গে দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান। লেবানন ছাড়ার আগে তিনি তার কর্মকর্তাদের বলে গিয়েছিলেন, নভেম্বর তাদের নিয়ে বৈঠক করবেন।
সাদ হারিরি তার মিডিয়া টিমকে বলে গিয়েছিলেন, লোহিত সাগরের তীরে শার্ম আলশেখ রিসোর্টে ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ ফোরামে তাদের সঙ্গে দেখা হবে। সেখানে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আলসিসির সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল তার। এরপর হারিরি সৌদি আরব গেলেন। সৌদি আরবে তার পরিবারের সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পত্তির মালিক।
সূত্রের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, নভেম্বর সকালে সৌদি প্রোটোকল অফিস থেকে ফোন করে সাদ হারিরিকে জানানো হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার বৈঠকের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল কি না জানা যায়নি।
অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট মাইকেল আউন লন্ডনে কূটনীতিদের বলেন, ‘সৌদি আরব সাদ হারিরিকে অপহরণ করেছে।এরপর সাদ হারিরিকে স্বাধীন চলাফেরা করতে দেওয়ার আহ্বান জানায় ফ্রান্স।
হারিরি তার পদত্যাগের ঘোষণাসংক্রান্ত বিবৃতিতে বলেন, তিনি গুপ্ত হত্যার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় আছেন এবং ইরান হিজবুল্লাহ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাদের সহযোগিতা না করার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তবে তার ঘনিষ্ট সহযোগীরা দাবি করেছেন, ‘তাদের প্রধানমন্ত্রী কখনো এমন শব্দ ব্যবহার করেন না উপরন্তু লেবাননের নেতারাও দাবি করছেন, তাকে আটকে রাখা হয়েছে অথবা অপহরণ করা হয়েছে।
সাদ হারিরির পদত্যাগের পরপরই সৌদি আরবে শুরু হয় আকস্মিক নাটকীয়তা। রাজপরিবারের ১১ রাজপুত্র, বর্তমানপ্রাক্তন মন্ত্রী ধনাঢ্য ব্যক্তিসহ প্রায় ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী কমিটি। ঘটনার সঙ্গে
হারিরি পরিবারের স্বার্থও জড়িতএমন খবর প্রকাশিত হয়। তার পরিবারের অন্য সদস্যদের স্বার্থে সাদ
হারিরিকে আটকে রাখা হয়েছে বলে লেবাননে তার ঘনিষ্টজনরা দাবি করেছেন এবং ইরানকে শায়েস্তা করতেই তাকে আটক করেছে সৌদি আরব। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করছে। তাহলে সাদ হারিরিকে নিয়ে আসলেই কী করতে চাইছে সৌদি আরব?
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। [ সূত্র : বিবিসি অনলাইন]