নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » রেড সিগন্যাল : ছোট ভূমিকম্প ও বাঙলাদেশ

রেড সিগন্যাল : ছোট ভূমিকম্প ও বাঙলাদেশ

আবারো ভূমিকম্প কাঁপিয়ে দিয়ে গেল বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ পুরো দেশ। বুধবার দেশের বিভিন্ন স্থানে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে এই ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। তীব্রতার দিক দিয়ে এটি একটি মৃদুু ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল দশমিক ৭। উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায়। ভূউপরিভাগের ৩৩ কিলোমিটার গভীর থেকে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি বলে আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে। এই ভূমিকম্পে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হলেও কোথাও কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে কম্পনের তীব্রতা যা হোক না কেনো, এই ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্যে একটি সতর্কবার্তা বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলোকে বাংলাদেশের জন্যরেড সিগন্যালহিসেবে বিবেচনায় নিয়ে মোকাবিলার জন্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার।
সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে একবার ভূমিকম্প সংগঠিত হয়। যার উৎপত্তিস্থলও ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে। রিখটার স্কেলে ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল .৫। ওই ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেঁপে ওঠাসহ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া কয়েকজন আহত হয় ওই ভূমিকম্পে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে বাংলাদেশ বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের মতে বাংলাদেশের অবস্থান দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ স্থলে। এছাড়া দেশের ভেতর থেকে ভূমিকম্প ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন তারা। বিগত কয়েক বছরের ভূমিকম্প পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ভূমিকম্পর সম্মুখীন হয়েছে দেশ। ক্ষয়ক্ষতি না হলেও এতে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তবে, আগামিতে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানার আশংকা করছেন ভূতাত্ত্বিকরা। তাদের মতে, ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকলে বড় ধরনের ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কল্পনার চেয়েও বেশি হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানলে ব্যাপক প্রাণহানি এবং কল্পনাতীত ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বাংলাদেশে। বুয়েটের গবেষকদের ভূমিকম্প ঝুঁকির মানচিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৪৩ শতাংশ এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে (জোন), ৪১ শতাংশ এলাকা মধ্যম (জোন) ১৬ শতাংশ এলাকা নিম্ন ঝুঁকিতে (জোন) রয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভূতাত্ত্বিক অবস্থানও ভূমিকম্পের সক্রিয় বলয়ে রয়েছে। চারটি বিপজ্জনক ফাটল লাইন রয়েছে ভূস্তরে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ভূস্তরের পাটাতনে ফাটলের ইউরোশিয়ান ইন্দোঅস্ট্রেলিয়ান প্লেটের ভূঅবস্থানগত ভূমিকম্পের জোনের মধ্যেই রয়েছে চট্টগ্রাম। প্লেট দুইটি অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণে ঘন ঘন হালকা থেকে মাঝারি মাত্রায় ভূমিকম্প হচ্ছে চট্টগ্রামে। যে কোনো সময় প্রবল ভূমিকম্প হলে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধসে পড়বে। চুয়েটের গবেষণা তথ্য মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে সীতাকুথেকে টেকনাফ ফল্ট (ভূফাটল) লাইন, চট্টগ্রাম ফল্ট লাইন এবং রাঙ্গামাটির বরকলের ফল্ট লাইন রয়েছে। চট্টগ্রামের মীরসরাই থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ ভূফাটল লাইন থেকে যে কোনো সময় বা এর বেশি মাত্রায় ভূমিকম্প হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ভেতর বাইরের মোট ১২টি উৎস থেকে বাংলাদেশ ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু ভূমিকম্প মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি যৎসামান্যই।
অবস্থায় বিল্ডিং কোড মানতে বাধ্য করাসহ নানা সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। দুর্যোগ কখনো কাউকে বলেকয়ে আসে না। তাই যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচিসহ সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রস্তুত থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন কমিউনিটিতে ভূর্মিকম্প পূর্ব পরবর্তী প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতে এই বিষয়ক পাঠ থাকা দরকার। বিদ্যুৎ, গ্যাস লাইন বন্ধের অটো সিস্টেম থাকতে হবে। ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিকায়ন বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আলাদা উদ্ধার ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। স্থলপথ বন্ধ হয়ে গেলে যাতে নৌপথ ব্যবহার করা যায় সেই বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে