নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » গ্রামের খোলা চিঠি

গ্রামের খোলা চিঠি

দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনাময় তিন অঞ্চলের নাম লোহাগাড়াসাতকানিয়াবাঁশখালী। প্রশাসনিক কাঠামোতে দুসংসদীয় আসনের তিন উপজেলা। একই সমান্তরালে পরস্পর ঘা ঘেঁষে পশ্চিমে বাঁশখালী মধ্যখানে সাতকানিয়া পূর্বে লোহাগাড়া। আয়তন, জনসংখ্যা প্রাকৃতিক সম্পদের দিক দিয়ে কোনটি কোনটির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভৌগোলিক সীমারেখায় বাঁশখালীর পশ্চিমে অবস্থিত অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ভাার সমৃদ্ধ দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর, পূর্বদিকে লেক পরিবেষ্টিত এবং সবুজের সমারোহে আবৃত পাহাড় বনাঞ্চল। অন্যদিকে সারি সারি পাহাড় আর অভ্যন্তরে ডলুটংকার মতো ১৩টি সৃজিত খালে ঘেরা পীর আউলিয়ার পুণ্যভূমি প্রাকৃতিক সম্পদের অপরূপ লীলাভূমি সাতকানিয়ালোহাগাড়া। প্রকৃতি যেন তিন অঞ্চলকে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে সাজিয়েছে। সাগর, পাহাড়, নদী, খাল সমতলভূমি বেষ্টিত এবং প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত তিন অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ স্তরে স্তরে শায়িত হলেও সরকারী উদ্যোগের অভাবে জনগণ তাদের প্রাপ্য সুফল থেকে বঞ্চিত। সরকারও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিমের ২৫ কিলোমিটার সমুদ্র বালুচর পূর্বের কিলোমিটার সৃজিত পাহাড় প্রকৃতির এক অপরূপ নিদর্শন। সম্ভাবনাময় সমুদ্র সৈকত পাহাড়ে অবস্থিত জলদী গ্যাস ফিল্ড অযতœ অবহেলায় পড়ে আছে। ১৮০০ হেক্টর বনভূমিতে বামের ছড়া ডানের ছড়া লেকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বাঁশখালী ইকোপার্কের সৌন্দর্যও হারিয়ে যেতে বসেছে। ৪০০ মিটার দীর্ঘ দেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার সমৃদ্ধ ইকোপার্ক এবং দীর্ঘ সমুদ্র বালুচরের সংস্কার আধুনিকায়ন করলে বাঁশখালী দেশের পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠবে। বাঁশখালীর দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চলে বিস্তীর্র্ণ মাঠেÑবিশেষ করে খানখানাবাদ, সরল, ামারা, বড়ঘোনা, ছনুয়া, শেখেরখীল এবং পুঁইছড়ির বিশাল এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে উৎপন্ন হচ্ছে লবণ। অঞ্চলের বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অফুরন্ত ভাার। নাপোড়ার পান, কালীপুরের লিচু পুকুরিয়ায় ১০০% কোলন চা উৎপাদিত হচ্ছে। চা সরাসরি এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হচ্ছে।
অঞ্চলের চা এশিয়া মহাদেশের সেরা চা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। অঞ্চলের সমতল ভূমিতে সারা বছরই ধান এবং পাহাড়ী এলাকায় প্রচুর শাকসবজিসহ আম, পেয়ারা, ছন, বেত, বাঁশ, চুন তৈরীর শামুক এবং উপকূলীয় এলাকাসহ সমতলভূমিতে নারিকেল, সুপারি, তাল উৎপাদিত হচ্ছে। ামারা, সরল, কাহারঘোনা, বড়ঘোনা, বাহারছড়া, এলাকার নদী পথে প্রচুর মালামাল উঠানামা হয়। অঞ্চলের হাটখালী চানপুরে সমুদ্র বন্দর, পাহাড়ী এলাকায় আগর, রাবার পাম চাষ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুশক্তি, সমুদ্র সৈকত, বিমানবন্দর, সাঙ্গু নদীতে ১৯৬৬ সালের প্রস্তাাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, সাগর থেকে আরো তেল গ্যাস আহরণ কেন্দ্র, ইপিজেড স্থাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় বাঁশখালী এদেশে দ্বিতীয় আরেকটি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে পরিকল্পিত উপায়ে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
অপরদিকে সাতকানিয়ালোহাগাড়া অঞ্চলেও রয়েছে বাঁশখালীর মতো প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। দুউপজেলার বিশাল পাহাড়ী অঞ্চলে প্রচুর শাকসব্জি, আম, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা, পান, ছন, বাঁশ, বেত এবং মূল্যবান গাছ জন্মে। দুঅঞ্চলের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ডলু টংকাসহ অন্যান্য খালে প্রতি বছর এক লাখ ঘনফুট বালি উৎপন্ন হয়। বালি এতই ঝকঝকে, পরিষ্কার সিলিকাযুক্ত যা দিয়ে সহজেই এলাকায় একটি কাঁচ শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। লোহাগাড়া উপজেলায় এশিয়ান হাতি প্রজননের অন্যতম অঞ্চল চুনতি অভয়ারণ্যটি প্রকৃতির আরেক অপরূপ লীলাভূমি। পশুপাখি এবং বৃক্ষের সমন্বয়ে ঘটেছে সাতকানিয়ালোহাগাড়ার পাহাড়ী অঞ্চল। দুউপজেলার প্রতিটি পাহাড়ী অঞ্চল যেন নিসর্গের লীলাভূমি। এসব অঞ্চলে সহজেই হতে পারে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র। ১৯৬০ সালে বাঁশখালী লোহাগাড়ার মাঝামাঝিদো ছাইল্যানামক পাহাড়ে ৫টি গ্যাসকুপ আবিষ্কৃত হয়, যা এখনো অবহেলায় পড়ে আছে। পাহাড়ী এলাকায় প্রচুর কঠিন পাথর, সাদা ধূসল বর্ণের ছোট ছোট শামুক পাওয়া যায়, যা দিয়ে ইস্পাত শিল্প কারখানা চুন তৈরী করা সম্ভব। এছাড়াও পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন লেকে সেচ প্রকল্প, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। এজন্য বলা হয়ে থাকে সাতকানিয়ালোহাগাড়া পুরো এলাকা যেন প্রাকৃতিক যাদুঘর। এলাকায় চা, রাবার, পাম চাষসহ, ডলু টংকাবতীখালে সেচ প্রকল্প বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। সর্বোপরি পুরো এলাকাকে ইকোজোনে পরিণত করা যাবে।
এই তিন অঞ্চলের মানুষ অত্যন্ত কর্মঠ। কৃষি ব্যবসা এসব অঞ্চলের মানুষের প্রধান কাজ। যেমন বাঁশখালীর শতকরা ৭০ ভাগ লোক কৃষিজীবী। অন্যদিকে সাতকানিয়ালোহাগাড়ার ৭০ ভাগ লোক ব্যবসায়ী। কথায় বলে সাতকানিয়ালোহাগাড়ার লোক পাতালপুরীতেও ব্যবসা করে। মানবসম্পদ, কৃষিসম্পদ, বনজসম্পদ, প্রাণীজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, খনিজ প্রাকৃতিক সম্পদ, সিলিকা, বালি, কঠিন পাথর, মুক্তা, চুন, লবণ, বায়ূশক্তি, চা, রাবার, পাম লিচু উৎপাদন সমৃদ্ধ উপযোগী অঞ্চল। বিশেষজ্ঞদের মতে এদেশ নাতিশীতোঞ্চ নদীমাতৃক হওয়ায় এদেশের উপকূলীয় এবং পাহাড়ী অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদের অত্যন্ত সম্ভাবনাময়ী। ফলে লোহাগাড়াসাতকানিয়াবাশখালী ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমিত এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অঞ্চল। কিন্তু এখানকার উপকূল পাহাড় প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হলেও আজ উপেক্ষিত অবহেলিত। তিন অঞ্চলে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে এদেশের অনেক জেলা বড় বড় শহরেও নেই। শুধু প্রয়োজন উক্ত অঞ্চলের এসব প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযথ কাজে লাগানো

লেখক : সহ: অধ্যাপক, আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম