সম্প্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে নতুন করে চাঙ্গাভাব দেখা যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৬০ ডলার ছুঁয়েছে, যা দুই বছরের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম ও সর্বোচ্চ। মূলত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারকদের জোট অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজের (ওপেক) আওতায় পণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলন হ্রাস সংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সরাসরি প্রতিশ্রুতির জের ধরে জ্বালানি তেলের বাজারে এ তেজিভাব দেখা গেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যটির উত্তোলন পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছার খবরকে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।
৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ব্যারেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম আগের দিনের তুলনায় ১ ডলার ৫৫ সেন্ট বেড়েছে। এদিন ভবিষ্যতে সরবরাহের চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ডবিব্লউটিআই বিক্রি হয় ৫৪ ডলার ১৯ সেন্টে, যা আগের দিনের তুলনায় ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি। এর আগের দিন প্রতি ব্যারেল ডবিব্লউটিআইয়ের দাম ৫৩ ডলার ৭৩ সেন্টে ওঠে, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে এদিন ভবিষ্যতে সরবরাহের চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড ৬০ ডলার ৪৪ সেন্টে বিক্রি হয়, যা আগের দিনের তুলনায় ১ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। পণ্যটির গত সপ্তাহের গড় মূল্যের তুলনায় এদিন প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অতিরিক্ত ২ ডলারে বিক্রি হয়। দুই বছরের বেশি সময় পর এদিন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমবারের মতো ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার ছাড়িয়েছে।
এর আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এক সাক্ষাৎকারে জানান, আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে ওপেকের চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে সৌদি আরব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এজন্য দেশটি সম্ভাব্য সবকিছু করতে প্রস্তুত আছে। এরই মধ্যে চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি প্রশাসন। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দরপতনের লাগাম টানতে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিকল্প দেখছে না দেশটি। তিনি আরো বলেন, ‘কুর্দিস্তানের গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয়ায় স্থানীয় কুর্দিদের সঙ্গে ইরাক সরকারের যে বিরোধ দেখা দিয়েছে, তার আশু সমাধানের সুযোগ বেশ কম। এ কারণে ইরাকের জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ কুর্দিস্তান থেকে আগামী দিনগুলোয় পণ্যটির সরবরাহ কমার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।’ যুবরাজ সালমানের এ সাক্ষাৎকার প্রচারের পর পরই চাঙ্গা হয়ে ওঠে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার। এমন একসময় তিনি এ বক্তব্য দিলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যটির উত্তোলন পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছার খবর মিলেছে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানায়, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক উত্তোলন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেড়ে ৯৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে সর্বোচ্চ। এ সময় পণ্যটির মজুদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ব্যারেল। চার সপ্তাহ পর দেশটিতে পণ্যটির মজুদ বাড়ল।
রিভকিন সিকিউরিটিজের পণ্যবাজারবিষয়ক বিশ্লেষক উইলিয়াম লাওলিন বলেন, কুর্দি সংকটের জের ধরে ইরাক থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি কমার সম্ভাবনায় কিছুদিন থেকেই পণ্যটির দামে তেজিভাব বজায় রয়েছে। এখন সৌদি যুবরাজের বক্তব্যে এ সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট আভাস মিলেছে। একই সঙ্গে তিনি ওপেকের চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ফলে আগামী দিনগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা, যা তাদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে পণ্যটির বাজারে। এর জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
তবে এক্ষেত্রে মার্কিন উত্তোলন খাতের চাঙ্গাভাব চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন উইলিয়াম লাওলিন। তিনি বলেন, ওপেকভুক্ত ও বহির্ভূত দেশগুলো যখন পণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলন কমাতে মরিয়া, তখন মার্কিন উত্তোলন খাতে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে; যা পণ্যটির কাক্সিক্ষত মূল্যবৃদ্ধিতে বৈশ্বিক উদ্যোগ বাস্তবায়নকে আরো সময়সাপেক্ষ করতে পারে।
[সূত্র : পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট]
মরিয়ম আকতার ব্যাংকার