নীড়পাতা » অর্থনীতি » প্র তি বে দ ন

প্র তি বে দ ন

২০০১ সালের নভেম্বরে বিশ্বের সবচাইতে বড় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গোল্ডমান সাক্স-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জিম ওনীল এক রিপোর্টে পরবর্তী দশকের একটা অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দেন। ব্রিটিশ এই অর্থনীতিবিদের রিপোর্টটি পরবর্তীতে সারা দুনিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতিবিদরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেন। ‘বিল্ডিং বেটার গ্লোবাল ইকনমিক ব্রিকস’ শীর্ষক সেই লেখায় ওনীল বলেন যে, পরবর্তী দশ বছরে বিশ্বের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে চারটি উদীয়মান দেশ- চীন, ভারত, ব্রাজিল ও রাশিয়া। এই দেশগুলির ইংরেজি বানানের প্রথম অক্ষরগুলিকে নিয়ে ওনীল বিআরআইসি বা ব্রিক শব্দটির উদ্ভাবন করেন। ওনীলের ব্রিক-এর সাথে সাউথ আফ্রিকার ‘এস’ যুক্ত হয়ে এখন ‘ব্রিকস’ নামের একটি সংস্থা বিশ্বের আলোচ্য বিষয়গুলির একটি।

২০০৯ সালে ব্রিক-এর জন্মের পর ২০১০ সালে সাউথ আফ্রিকা তাতে যোগ দেয়। এই পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ব্রিকস-এর মূল উদ্দেশ্য দাঁড়ায় উন্নত দেশগুলির চালিত বিশ্ব ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে বিশ্বের অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে নিয়ে আসা। ব্রিকস-এর বয়স যখন প্রায় এক দশক হতে চলেছে, তখন অনেকেই এর সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাবের সাথে নিজেদের পূর্বাভাসকে মিলিয়ে দেখছেন।
ওনীল, যাকে ‘মিস্টার ব্রিক’ বলে ডাকা হয়ে থাকে, ২০১৬ সালে সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাতে বলেন যে, তার ভবিষ্যৎবাণী হয়তো অর্ধেকের মতো সফল হয়েছে। চারটি দেশের মাঝে দু’টি দেশ গত দেড় দশকে ব্যাপক অগ্রসর হয়েছে চীন ও ভারত। অন্যদিকে, ব্রাজিল ও রাশিয়া অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। ওনীল বলেছিলেন যে, ২০১১ সাল পর্যন্ত চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে গড়ে ৭ শতাংশ, যা কিনা পরবর্তীতে অনেক বেশিই হয়েছে। এবং বেশিই শুধু নয়, ২০১১ সালের পরও সেটা অব্যাহত ছিল। আর ২০১৬ সালে এসে ভারতের প্রবৃদ্ধিকে ৭ শতাংশের ওপরে দেখেও ওনীল জ্ঞানীর হাসি হাসছেন। ওনীল ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, চারটা দেশকে নিয়ে, দেশগুলির তৈরি করা সংস্থাকে নিয়ে নয়। এই সংস্থার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ কী? আর ‘ব্রিক’ থেকে ‘ব্রিকস’ হবার পর ওনীল কিন্তু সাউথ আফ্রিকা নিয়ে কথা বলছেন না। তাহলে ব্রিকস-এর মাঝে সাউথ আফ্রিকারই বা ভবিষ্যৎ কী?
ব্রিকস নিয়ে কিছু দিন আগেই ‘ইন্ডিয়ান ইকনমিক সামিট’কে উপজীব্য করে দিল্লীর ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট সামির সরণ একটা মতামত লেখেন ‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’এ। তিনি বলেন যে, ব্রিকস অনেক কিছুই করতে পেরেছে, বিশেষ করে এর পাঁচটি সদস্য দেশের মাঝে বাণিজ্য বৃদ্ধি করা ছাড়াও ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এনডিবি) এবং ‘কনটিঞ্জেন্সি রিজার্ভ এরেঞ্জমেন্ট’এর মাধ্যমে দেশগুলিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু পাঁচটি দেশের পাঁচ রকম রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকায় এর সাফল্য বেশ সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে। দেশগুলি নিজেদের কিছু লক্ষ্যকে অন্তত একস্থানে আনতে পেরেছে, যা কিনা বেশ ভালো একটা সাফল্য, যদিও বা সেই সাফল্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। জনগণের মাঝে এর উদ্দীপনা তেমন একটা ছড়ায়নি বললেই চলে।
জনগণের সম্পৃক্ততার অভাবের একটা উদাহরণ টেনে রুশ সংবাদ মাধ্যম ‘স্পুতনিক’ এক প্রতিবেদনে বলেছে, চীন এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক নীতি ব্রিকস-এর উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। স্পুতনিক রাশিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এক নতুন উদ্যোক্তা প্রতিভার উল্লেখ করে বলে যে, তারা পশ্চিমা উন্নত দেশগুলি ছাড়াও চীন, ভারত এবং ব্রাজিলে বাজার খুঁজছে। এই দেশগুলির বিশাল জনসংখ্যা রাশিয়ার উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যবসা সম্প্রসারণের লোভনীয় সুযোগের হাতছানি। তবে এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সেখানে সাউথ আফ্রিকার কোন নাম নেই গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে। অর্থাৎ ব্রিকস-এর অংশ হলেও সাউথ আফ্রিকা আসলে ভেতরে থেকেও বাইরে!
সাউথ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড্যানি ব্র্যাডলাউ ব্রিকস-এ সাউথ আফ্রিকার অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে খুব বেশি ভালো কিছু পাননি। ‘দ্যা কনভারসেশন’এ এক লেখায় তিনি বলেন, যে বিশ্বের দরবারে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে অর্থনৈতিক নেতৃত্বের আসনে বসাতে সংস্থাটি একেবারেই সক্ষম হয়নি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলির গ্রুপ ‘জি-৭’ থেকে পরবর্তীতে ‘জি-২০’ তৈরি করা হয়, যার মাঝে ব্রিকস-এর দেশগুলিও রয়েছে। কিন্তু সেই ফোরামে গিয়ে ব্রিকস নেতারা ব্রিকস-এর স্বার্থ দেখেননি। সেখানে যাদের অর্থনৈতিক শক্তি বেশি, তারাই জোরেশোরে কথা বলেছে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশগুলির অধিকারের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেক্ষেত্রে লাভবান হয়েছে চীন, ভারত ও ব্রাজিল।
সেখানে সাউথ আফ্রিকা কিছুই পায়নি বলে বলছেন প্রফেসর ব্র্যাডলাউ। তিনি ব্রিকস-এর উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এই বলে যে, ব্রিকস তার উদ্দেশ্য কিভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেটা নিয়ে কারুরই কিছু বলার নেই। এখানে স্বচ্ছতার যথেষ্টই অভাব রয়েছে। ব্রিকস পারেনি আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংককে সরিয়ে দিতে।
কিন্তু আসলেই কি চীন, ভারত ও ব্রাজিলেরই লাভ হয়েছে? সামির সরণ কিন্তু তার লেখায় বলছেন যে, হিমালয়ের পাদদেশে দোকলাম ইস্যু ভারত-চীনের রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাকে প্রশ্নের মুখেই রেখে দিচ্ছে। সরণ আরও বলছেন যে, চীন ‘ব্রিকস-প্লাস’ নামের আরেকটি সংস্থার জন্ম দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’এর সাফাই গাইছে, যা কিনা ভারতের লক্ষ্যের সাথে যাচ্ছে না। তিনি ব্রিকস-এর সদস্য দেশগুলির মাঝে গণতান্ত্রিক চেতনার অভাবের কথাও বলেছেন– সকল দেশ সেখানে সমান অধিকার রাখছে না। অর্থাৎ ভারতীয়রাও যে খুব বেশি খুশি রয়েছেন ব্রিকস নিয়ে, তা চিন্তা করার সুযোগ নেই।
ব্রাজিল আর রাশিয়ার সমস্যাগ্রস্ত অর্থনীতিকে বাঁচাতে ব্রিকস কতটা করেছে, সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এটা সকলেরই জানা যে, ব্রিকস এই দেশ দুটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। সাউথ আফ্রিকাকেও সংগঠনের অন্য চারটি দেশ এক কাতারে রাখেনি। একেক দেশের জাতীয় নীতি ভিন্ন হওয়ায় তা তাদের জনগণকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুবিধা ভোগ করা থেকে বিরত রেখেছে। আবার ভারতও তার ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সাথে একই টেবিলে বসে অর্থনৈতিক লেনদেন করেছে বেশ সাবধানেই। দেশগুলির নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ব্রিকস-এর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সাথে এক পথে হাঁটেনি। অথবা এটাও বলা যেতে পারে যে, ব্রিকস-এর নিজস্ব কোন ভূরাজনৈতিক স্বার্থই নেই পাঁচটি দেশের বিপরীতমুখী ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া।
আগামী দশকে ব্রিকস কোনদিকে যাবে? ব্রিকস-এর অর্থনৈতিক সহযোগিতা হয়তো বন্ধ হবে না, তবে উদ্দেশ্য এবং সাফল্যও যে সীমিতই থাকবে, তা বলা যায়। জিম ওনীল-এর মতো করে বলতে গেলে অর্ধেকের মতো সফল হতে পারে হয়তো! [সূত্র : পত্রপত্রিকা]
রাকিবুল হক