নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » হারিয়ে যাওয়া আড্ডার খোঁজে

হারিয়ে যাওয়া আড্ডার খোঁজে

বিশেষ উৎসবের ছুটিতে আদিবাড়িতে গেলে খুঁজি হারানো অনেক মানুষের মুখ। খুঁজি জীবনের হারানো অনেক অনুষঙ্গ। আড্ডা তেমনই একটি বিষয়।
‘সারাদিন কোর্ট-কাচারিতে আর সন্ধ্যা-রাতে চেম্বারে মক্কেলদের সাথে চরম পেশাগত ব্যস্ততার ফাঁকে বিকালে কিছুক্ষণের জন্য আড্ডায় বসলে মনটা রিফ্্েরশ হয়। কাজে-কর্মে-দিনযাপনে পুনরায় উদ্যম ফিরে পাই আড্ডায়’। বললেন, অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন। কিশোরগঞ্জ শহরের পুরনো স্টেডিয়াম মার্কেটের আড্ডায় কথা বলছিলেন তিনি। প্রতিদিনই এখানে একটি নিয়মিত আড্ডা জমে। আড্ডার স্থায়ী সদস্য ১৫/২০ জনের মধ্যে ওঠানামা করে। ‘সবাই রোজ হয়ত আসতে পারেন না নানা কারণে। তবে ১০/১৫ জন প্রতিদিনই উপস্থিত থাকেন’, জানালেন দোলন বাবু।
পুরনো স্টেডিয়ামের আড্ডার বেশির ভাগ সদস্যই বয়সে প্রবীণ এবং পেশায় প্রধানত আইনজীবী, শিক্ষক, এনজিও কর্মকর্তা। প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তিযোদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী লোকজনই এখানে আসেন। আলোচনা করেন দেশ-বিদেশের নানা বিষয় নিয়ে। স্থানীয় দুর্নীতি, অনিয়ম, উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়েও নানা কথা ও বিশ্লেষণ হয় সদস্যদের মধ্যে।
‘শহরের নাগরিক জীবন ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটে আড্ডায়। পাওয়া যায় বিভিন্ন খবরাখবর। আড্ডায় এলে নিজেকে অনেক সজীব মনে হয়’, সরল স্বীকারোক্তি করেন আড্ডার নিয়মিত সদস্য মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান মুক্তু।
তথ্য-প্রযুক্তির রমরমা সময়ে মানুষের জীবন-যাপনের পরিবর্তনসমূহ লক্ষ্য করার জন্য শহরের আড্ডাগুলোর খোঁজ করছিলাম। সাধারণভাবে বলা হয়, মানুষ এখন অনেক বেশি টিভিমুখী। বাইরে খুব একটা বের হতে চান না। এ কথা পুরোটা সত্য নয়। মনের টানে, মেশার টানে মানুষ প্রতিনিয়তই মিশছেন সম-মনা মানুষের সঙ্গে। নিয়মিতই যোগ দিচ্ছেন নির্দিষ্ট আড্ডার আসরে।
‘এটা ঠিক যে স্যাটেলাইট চ্যানেল মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে সময়ের অনেকটাই নিয়ে নিচ্ছে। তারপরও আড্ডা বন্ধ হয় নি। বাঙালি জীবনে আড্ডা-আলোচনা একটি অপরিহার্য অনুসঙ্গ’, মন্তব্য করলেন সামাজিক আন্দোলনের নেতা নাসিরউদ্দিন ফারুকী। জেলা পাবলিক লাইব্রেরির আড্ডায় তাঁকে পাওয়া গেল। এখানে কলেজের অধ্যাপক, স্থানীয় লেখক-সাংবাদিকরা নিয়মিত আসেন। নতুন বইয়ের খোঁজ-খবর নেন। নিজেরা কি লিখছেন বা পড়ছেন, সেটাও আলোচনা করেন।
‘আড্ডায় এলে নিজের চিন্তা ও চেতনাকে শাণিত করা যায়। নিজের মনোভাবের সঙ্গে অপরের ভাবনার তুলনা ও সামঞ্জস্য বিধান করাও সম্ভব হয়। আড্ডা-আলোচনার ইতিবাচক দিককে অস্বীকার করার উপায় নেই’, এমন মত ব্যক্ত করলেন ফারুকী সাহেব।
জেলা প্রেসক্লাবে সন্ধ্যার মুখে দেখা গেল জমজমাট আড্ডা। অধিকাংশই বিভিন্ন পোর্টাল, টিভি ও সংবাদপত্রের স্থানীয় সংবাদদাতা। ‘এখানে শুধু আড্ডা হয় না, পেশাগত আড্ডা-আলোচনাই প্রধানত চলে’, প্রেসক্লাব সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম জানালেন, ‘সারা দিন কাজ করার পর স্থানীয় সংবাদের একটা নিটোল পর্যালোচনা হয় এখানে। কে কোন নিউজ মিস করেছে, কোথায় কি ঘটতে যাচ্ছে, এসব বিষয়ই মুখ্য এখানকার আড্ডায়। পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে সকলের নিয়মিত যোগাযোগ, আড্ডা ও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’
এইসব প্রাতিষ্ঠানিক আড্ডার বাইরেও ভাসমান আড্ডাকেন্দ্রে ভরে আছে পুরো শহর। বিকেল-সন্ধ্যায় গুরুদয়াল কলেজের বিশাল সবুজ মাঠে গোল গোল বৃত্তে আড্ডা-মগ্ন অবস্থায় দেখা পাওয়া গেল অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে। বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা নিজ নিজ আড্ডায় আলোচনা করেন বিভিন্ন বিষয়। এখানে আবৃত্তি ও নাটকের দলের ছেলেমেয়েদেরই প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেল। প্রায় সবারই হাতে মোবাইল। একা বা সবাই মিলে স্ক্রিনে দেখছে কোন সাইট।
‘কলেজ মাঠের আড্ডায় পড়াশোনা, কোর্স এসাইনমেন্ট, প্রেজেনটেশন নিয়েও কথা-বার্তা হয়। ক্লাস শেষে এখানেই লেখাপড়ার খানিকটা চাপ কমিয়ে নেয় অনেকেই।’ বন্ধুদের মাঝ থেকে বলল সানজিদা নূর। অর্থনীতিতে অনার্স করছে সে। পাশে বসা রাকিবুল হাসান ইতিহাস নিয়ে পড়ে। ‘ভাল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাওয়ায় এখানেই আমরা উইকিপিডিয়া বা অন্য কোনো সাইট থেকে রেফারেন্স ডাউন লোড করি। বৃত্তি বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ খুঁজি।’ এক কোণে বসা বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী মালিহা হাসতে হাসতে বলল, ‘স্যাররা বিকেলে মাঠের পাশে ইভিনিং ওয়াক করেন। নানা সংগঠনের বড় ভাইরা চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। ইভটিজিং বা অন্য কোনো নিরাপত্তাজনীত সমস্যা এখানে হয় না। আমরা বেশ নিবিঘেœ আড্ডা দিতে ও কাজ করতে পারি।’
সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক বিষয়ভিত্তিক আড্ডার আসর বসে শহরের রঙমহল সিনেমা হল সংলগ্ন ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের আশেপাশে। এখানেই শহরের মূল সড়ক স্টেশন রোডের ওপর অনেকগুলো অস্থায়ী চা-স্টলে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা আড্ডায় মশগুল থাকেন। পাশেই আওয়ামী লীগ অফিসের আশপাশও ভরপুর থাকে নেতা-কর্মীদের সরগরম আড্ডা-আলোচনায়। বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা আড্ডায় সমবেত হন কাচারি বাজারের চারপাশে। জাতীয় পার্টির লোকজন নির্দিষ্ট কোথাও বসেন না। নেতাদের বাসার চেম্বারে আড্ডা দেন।
রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডার বাইরেও দেখা মিলল এলাকাভিত্তিক আড্ডার। গৌরাঙ্গ বাজার, আখড়া বাজার, বড় বাজার ব্রিজের দুই পাশেই স্থানীয় ছেলেমেয়েরা বিকেলের দিকে ভিড় জমায়। চা-কফি খেতে খেতে সন্ধ্যার আগেই সেরে নেয় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে জরুরি আলাপ-আলোচনা। সন্ধ্যার পর এসব আড্ডা আর থাকে না। মূলত স্কুল-কলেজের স্থানীয় শিক্ষার্থীরাই এখানকার আড্ডার সদস্য। পাড়ার অভিভাবক ও সিনিয়রদের কড়া নজরের মধ্যে এসব আড্ডা সামাজিক আলোচনার গ-ি অতিক্রম করার সুযোগ পায় না। ‘সুস্থ ও সম্মানজনকভাবে ছেলেমেয়েরা মেলামেশা করলে অনেক সামাজিক সমস্যা ও অপরাধ কমে যায়। নিজেদের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক বিকাশের জন্য আমরা চাই এলাকার ছেলেমেয়েরা পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ আচরণ ও অভ্যাসে অভ্যস্থ হোক’, জানালেন পুরান থানা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা কামাল সাহেব।
কিশোরগঞ্জের একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক যোগাযোগ ও মিলনস্থল হলো ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদের চত্ত্বরের আড্ডা। আসরের নামাজের পর থেকে এশার নামাজ পর্যন্ত এখানে লোকজন গমগম করে। মূলত অবসরপ্রাপ্ত ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ এখানকার নিয়মিত সদস্য। অফিস শেষে অনেকেই আসরের নামাজ পড়তে মসজিদে এসে এশার নামাজ আদায় করে বাড়ি ফেরেন। মাঝখানের সময়টুকু মসজিদের বাইরের টাইলস বাধানো চত্তরে বসে কাটান বহুজন। পাশের চা, নাস্তার দোকান থেকে আসে পছন্দনীয় হাল্কা খাবার। নামাজের সময়টুকু ছাড়া পুরো জায়গাটা জমজমাট হয়ে থাকে মুসুল্লিদের আড্ডা ও কোলাহলে। অনেকে বাসায় বলে রাখেন রাখেন, ‘দরকার হলে মসজিদ চত্ত্বরে খোঁজো’। শহরের মানুষও মোটামুটি জানে, কাকে কাকে বিকাল-সন্ধ্যায় এখানে পাওয়া যাবে। এই আড্ডায় মূলত ধর্ম ও ইতিহাস বিষয়ক আলাপ-আলোচনা চলে।
দৃশ্যত ইতিবাচক ও উৎসাহমূলক হলেও বাঙালি চরিত্র্যের আটপৌরে বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরচর্চা, মিথ্যাচার ও নিন্দাবাদের আসরও বসে কোনো কোনো আড্ডায়। ‘শহরের সব কুসংবাদ পাবেন ওখানে গেলে’, একটি বিশেষ আড্ডার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে একজন আমাকে জানালেন। আশার কথা হলো, এগুলো সংখ্যায় খুবই কম এবং সকলের কাছেই চিহ্নিত। ফলে অধিকাংশ মানুষই এসব নেতিবাচক আড্ডা এড়িয়ে চলেন।
বাঙালি সমাজজীবনে আড্ডা একটি পুরনো অভ্যাস। কলকাতার কফি হাউস বা রক-এর আড্ডা কিংবা ঢাকার শাহবাগের আজিজ, কনকর্ড, বেইলি রোডের আড্ডা ইতিহাস হয়ে আছে। প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে চলছে এসব আড্ডা। বয়স, শ্রেণি, পেশা, রুচি, অভ্যাস, চিন্তা, চেতনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠছে আলাদা আলাদা আড্ডাস্থল। স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে নানা বয়েসী মানুষ নিত্য প্রণোদিত হচ্ছে নিজ নিজ পছন্দের আড্ডা-আলোচনার আসরে। নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করছে কিংবা অন্যের চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত হচ্ছে।
নানা দিক থেকে আড্ডা এখনো মিশে আছে বাঙালির চিরায়ত জীবন-যাপনের পরতে পরতে। শুধু শহর বা মেট্রোপলিটনেই নয়, দূর-মফঃস্বলের নিভৃত জীবন তরঙ্গেও ঢেউ তুলছে নানা আকার ও আঙিকের আড্ডা। ডিজিটাল যুগের স্যাটেলাইট সংস্কৃতিতে মানুষ টিভি সেটকে অনেক বেশি সমাদার করছে বটে। তাতে কিন্তু চিরকালীন আড্ডা মোটেও হারিয়ে যায় নি বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবন থেকে। অপ্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রথাগত চিন্তাচর্চার ক্ষেত্র হিসাবে আড্ডা এখনো রয়েছে সচল ও সজীব।

লেখক : কবি-গবেষক। অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Share