‘রথে চ বামনাং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’- অর্থাৎ রথে জগন্নাথদেবকে দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। ‘রথ’ এই কথাটি মনে হলেই এমন একটি যান এর কথা আমাদের মনে হয় যেটি আমাদেরকে হৃদয়কে বা নৈসর্গিক আনন্দে আন্দোলিত করে। ওই রথে যে কোনও দেবতা বা যে কোনও মহামানবের উপস্থিতি আমরা অনুভব করি। তাই ধর্মীয়পুরাণে কোন যুগ হতে রথের প্রচলন হয়েছিল তা যেমন বলা শক্ত তেমনি এটি নিশ্চিত এই শুভাগমন যানটি’র উপস্থিতি ছিল প্রতিটি যুগে ও সভ্যতায়।
রথে দেবতাদের অধিষ্ঠিত করে লক্ষ লক্ষ ভক্তের শোভযাত্রা যে কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা বলা কঠিন। জানা যায় কৃষ্ণ ও বলরামকে কু-উদ্দেশ্যে মথুরায় আনয়নের জন্য মামা কংস রথসহ অক্রুরকে পাঠালেন গোকুলে। অক্রুর যখন রথে করে কৃষ্ণ ও বলরামকে মথুরায় আনছিলেন তখন পিছনে পড়ে রইলেন গোকুল আর সমস্ত গোপিনীরা, সমস্ত কৃষ্ণভক্তরা তাঁরা সবাই সেই রথের পিছনে পিছনে শোভাযাত্রা করে আসছিলেন। এই ঘটনাটিই নাকি রথযাত্রা শুরুর অনেক ঘটনার মধ্যে অন্যতম ঘটনা হিসাবে ধরা হয়।
আবার ভক্তদের বিশ্বাস, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা এক সঙ্গে দ্বারকা শহরের সৌন্দর্য দেখতে বের হন এবং ভক্তরা ওই দিন রথে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাকে নিয়ে বিরাট শোভাযাত্রা করে যাত্রা করেন এবং সেদিন হতেই নাকি প্রথম রথযাত্রার সূচনা হয়।
রথযাত্রার কথা এলেই প্রথমেই পুরীর রথযাত্রার চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বলরাম এতটাই শোকে দুঃখে কাতর হয়েছিলেন যে, শ্রীকৃষ্ণের অর্দ্ধদগ্ধ দেহ চিতা থেকে তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন। সেই সময় পুরীর রাজা ইন্দ্রদ্যু¤œ স্বপ্নে দেখেন যে শ্রীকৃষ্ণের অর্দ্ধদগ্ধ দেহ ভাসতে ভাসতে পুরীর সমুদ্রে এসে পৌঁছেছে। রাজা সেই সময় পুরীর সমুদ্রে এক অস্থির সন্ধান পান এবং স্বপ্নে নির্দেশ পান রাজা যেন এই অস্থি নির্মিয়মান মন্দিরের মূর্তির ভিতর স্থাপন করেন। কিন্তু কে মূর্তি গড়বে? সেই নিয়ে প্রশ্ন দেখা যায়। শোনা যায় স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা বৃদ্ধের রূপ ধারণ করে মূর্তির কারিগর হিসেবে রাজার দ্বারা ওই কাজে নিযুক্ত হন। কিন্তু বিশ্বকর্মা রাজাকে একটি শর্ত দেন, তিনি একাকী একটি বন্ধ ঘরে টানা তিন সপ্তাহ ধরে মূর্তি তৈরি করবেন। মূর্তি তৈরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ দরজা খুলতে পারবে না। বেশ কিছুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাজা মূর্তি দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন এবং শর্তভঙ্গ করে বন্ধ দরজা খুলে ফেললেন। কিন্তু ভিতরে শিল্পী বিশ্বকর্মার দেখা পেলেন না। রাজা মন্দিরে এক অসম্পূর্ণ মূর্তির দর্শন করলেন এবং নিজের কৃতকর্মে মানসিক যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে লাগলেন। এবার রাজাকে জগন্নাথ দেব স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং আশ্বস্ত করলেন আমি এই ধরাধামে এইরূপেই পূজিত হব। তারপর থেকে জগন্নাথদেব এইভাবেই পূজিত হতে লাগলেন।
জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার ধর্মীয় বিশ্বাস, শ্রীজগন্নাথ ভগবানেরই এক রূপ। দ্বারকার বিলাস বৈভব থেকে বৃন্দাবনে শ্রীরাধা এবং সাধারণ মানুষের ভালবাসার ডাকে সাড়া দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বেরিয়ে পড়েছিলেন। জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকে ওই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। পুরীর মন্দির থেকে গু-িচা অর্থাৎ মসির বাড়ির যাত্রাকে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে যাত্রারই পুনরাবৃত্তি হিসাবে ভক্তেরা মনে করেন। প্রভু ওই যাত্রায় পথে সাধারণকে দর্শন দেন আর রথ রজ্জু ধরে টানার অর্থ পরম প্রেমময় পুরুষকে ভক্তরা নিজের হৃদয়ে টেনে এনে অধিষ্ঠিত করেন।
‘স্কন্দপুরানে’ উৎকল খ-ে আছে ভগবান জগন্নাথ মহারাজ ইন্দ্রদ্যু¤œকে বলেন, ‘আমি জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছি।” তাঁর নির্দেশে এই দিনেই ¯œানপূর্ণিমা বা জগন্নাথদেবের পুণ্য ¯œানযাত্রা পালন করা হয়। সত্যযুগে ¯œানযাত্রা ও রথযাত্রা দ্বিতীয় মনুর সময় প্রবর্তিত হয়। পুরানের মতে ব্রহ্মার একদিনে ১৪জন মনুর সময়কাল চলে, স্কন্দপুরানের মত অনুযায়ী এখন বৈবস্বত্ব মনু অর্থাৎ সপ্তম মনুর সময়, এরপর আরও সাতজন মনু আসবেন। এখনও সেই ¯œানযাত্রা ও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে।
প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় জগন্নাথদেবের যে বিশেষ ¯œান অনুষ্ঠিত হয় তাঁকেই ¯œানযাত্রা বলা হয়। ওই দিনটিতেই জগন্নাথদেবের আবির্ভাব দিবস হিসাবে স্মরণ করা হয়। জগন্নাথদেবের নির্দেশ অনুসারে ওই উৎসবের পর তিনি এক পক্ষকাল অদর্শন থাকেন। তখন গর্ভগৃহে তাঁর দেহ সুচিত্রিত ও সুসজ্জিত করা হয়। তাঁকে বিশেষ ধরনের মিষ্টান্ন ও পানীয় দেওয়া হয় এবং তাঁর জ্বর হয় ও জ্বর নিবারনের জন্য দশমুলা’ নামক পাঁচন দেওয়া হয়। ওই সময়কে বলা হয় ‘অনবসর কাল’ বা ‘বিশ্রাম মুহূর্ত’। এর এক পক্ষকাল পরে তিনি আবার দর্শন দেন। একে বলে ‘নেত্রোৎসব’ বা ‘নবযৌবনোৎসব’। উক্ত অনুষ্ঠানগুলি সবই বোধহয় আবহাওয়ার সঙ্গে জড়িত। ওই সময়প্রচ- গরম পড়ে। তাই দেবদেহকে ঠা-া করার জন্যই এই বিধি। ¯œানযাত্রার পরই আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
শ্রীক্ষেত্র বা পুরীতে গতবছর রথ উৎসব উপলক্ষে নিজে গিয়ে স্বচোক্ষে দেখেছি এবং ওখানকার পা-িত্য ব্যক্তিবর্গদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে জেনেছি, রথযাত্রাকে স্থানীয় লোকেরা বলেন ‘গু-িচা যাত্রা’। রাজা ইন্দ্রদ্যু¤েœর স্ত্রীর নাম ছিল ‘গু-িচা’। প্রতি বছর এই রথযাত্রায় তিনটি নতুন রথ তৈরি হয়। আগে পুরীর রাজা রথের কাঠ যোগাতেন। যা বর্তমানে সরকার করে। অক্ষয়তৃতীয়ার দিন একটি বনযজ্ঞ অনুষ্ঠান করে রথ নির্মাণ শুরু হয়। প্রত্যেকটি রথই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যম-িত। জগন্নাথদেবের রথের নাম ‘নন্দী ঘোষ’। সাত ফুট পরিধির ষোলটি চাকার উপর স্থাপিত। উচ্চতা ৪৫ ফুট, প্রস্থে ৪৫ ফুট, হলুদ রং। বলভদ্রের রথের নাম ‘তলিধ্বজ’। যেটি ১৪ চাকার উপর প্রতিষ্ঠিত। উচ্চতা ও প্রস্থ ৪৪ ফুট, রং নীল। সুভদ্রার রথের নাম ‘পদ্মধ্বজ’ বা ‘দেবদলন’। উচ্চতা ৪৩ ফুট, গাঢ় লাল রঙে রঞ্জিত। জগন্নাথ ‘পীতাম্বর’, বলভদ্র ‘নীলাম্বর’ ও সুভদ্রা ‘রক্তাম্বরী’।
রথগুলি তৈরি সম্পূর্ণ হলে মন্দিরের প্রধান ফটকে দুয়ারের সামনে এনে দাঁড় করানো হয়। উৎসব যেদিন শুরু হয়, সকালে পূজা শেষে পা-ারা দেবতাদের ২২টি সিঁড়ির ধার পার হয়ে রথে প্রতিষ্ঠিত করেন। পুরীর রাজা সোনার ঝাড়– দিয়ে রথ ও পথ পরিষ্কার করেন। ঝাড়– দেবার পর রথ চলতে শুরু করে। সকলেই মহা উৎসাহে রথের দড়ি ধরে টানে। অবশেষে রথ গু-িচা বাড়ি পৌঁছায়। সেখানকার মন্দিরে দেবতারা অধিষ্ঠিত হন। রথ মন্দিরের বাইরে থাকে। সাতদিন পর রথ মূল মন্দিরে ফিরে আসে, সেদিন রথ দেবতাসহ মূল মন্দিরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে। পরদিন একাদশীতে দেবতাদের সোনার গয়নায় সাজিয়ে আনা হয়। এর নাম সুনাবেশ। মন্দিরে ঢোকার সময় লক্ষ্মী ও জগন্নাথের মধ্যে বাকবিত-া হয়। জগন্নাথ লক্ষ্মীকে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন। রাগে ও দুঃখে লক্ষ্মী মন্দিরের দরজা বন্ধ রাখেন। তিনি জগন্নাথকে আর মন্দিরে ঢুকতে দেবেন না তাই। এর নাম হল ‘লক্ষ্মী নারায়ন ভেট’। এরপর দামি উপহার দিয়ে জগন্নাথ লক্ষ্মীকে তুষ্ট করেন। লক্ষ্মী দুয়ার খুলে দেন। দেবতারা স্ব স্ব স্থানে অধিষ্ঠিত হন। রথযাত্রার অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। এই রীতি অনুযায়ী পুরীতে জগন্নাথ দেবের রথ উৎসব পালিত হয়।
আমরা রথযাত্রাকে তিনপ্রকারদৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করতে পারি। যেমন সামাজিক, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক। শ্রীঅরবিন্দ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করে রথযাত্রা সম্বন্ধে বলেছেন, জগন্নাথের রথ হচ্ছে আদর্শ মানব সমাজ। যার চারটি চাকার অর্থ ঐক্য, স্বাধীনতা, জ্ঞান ও শক্তি। রবীন্দ্রনাথ রথযাত্রাকে মানবসভ্যতার জয়যাত্রারূপে কল্পনা করেছেনএবং তিনি এই সভ্যতার জয়যাত্রায় গণশক্তিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। রথের দড়ি হচ্ছে জনগণের ঐক্যবন্ধন। জগন্নাথদেবের আশীর্বাদে, মানুষের টানেই আমরা যেন এগিয়ে যাই Ñ এই প্রত্যাশা করি। শুভ রথযাত্রা।

Share