নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » রোহিঙ্গা মুসলিম বিপন্ন ও দিশেহারা জনগোষ্ঠী

রোহিঙ্গা মুসলিম বিপন্ন ও দিশেহারা জনগোষ্ঠী

মায়ানমার বা বার্মার পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইন বা আরাকান-এর একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর নাম ‘রোহিঙ্গা’। এরা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। মহানবী (সা.) এর জীবদ্দশায় বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবু ওয়াক্কাস ইবনে ওয়াইব (রা.) এর হাত ধরে আজকের আরাকানে ইসলাম ধর্মের প্রচার ঘটে। খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনামলে আরাকানের শাসকদের সঙ্গে আরব মুসলিমদের যোগাযোগের বিষয়টিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। বর্তমান মায়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় বসবাসকারীরা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে নৌকার মানুষ। যারা সমুদ্রজলে নৌকা ভাসিয়ে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ইতিহাসবিদদের মতে, আরবি শব্দ ‘রহম’ (দয়া করা) থেকে রোহিঙ্গা শব্দের উদ্ভব। খৃস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আরবের বাণিজ্য জাহাজ রামব্রি দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। তখন তারা ‘ রহম! রহম’ বলে আল্লাহর কাছে দয়া ভিক্ষা করে। সে থেকেই তারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিতি লাভ করে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নাম ‘রোহিঙ্গা’। বর্তমান মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে তা মানবিকতার চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। যাকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম নির্যাতন বলাই সঙ্গত। পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুরা কমবেশি নির্যাতিত-নিগৃহীত হয়। তবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে জুলুম-নির্যাতন করা হচ্ছে তা বিশ্ববিবেককে নাড়া দেওয়া মতো। একটা দেশের প্রশাসন কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তা দেখার এবং বোঝার জন্য একমাত্র মায়ানমারই সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।
মায়ানমার বা বার্মাকে বলা হয় মগের মুল্লুক। মগের মুল্লুকেরা মগরা নিরস্ত্র ও অরক্ষিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালাচ্ছে তা রীতিমত বীভৎস ও লোমহর্ষক। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর প্রেতাত্মা ভর করেছে বর্মী সেনা ও তাদের দোসর মগদের ঘাড়ে। জানা যায়, রোহিঙ্গা মুসলমানদের পশু-পাখির ন্যায় নির্বিচারে গুলি করে মারা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তাদের হত্যা করার পর মৃতদেহগুলো নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, মগ সেনারা সেদেশের রোহিঙ্গাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে এমনকি শিশু-কিশোরদের জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপের মত নৃশংসতার পরিচয় দিচ্ছে। পত্র-পত্রিকা, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম, ওয়েবসাইটে যে সব চিত্র ও সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে তাতেই বুঝা যায় রোহিঙ্গা জনগণের জীবনকে নরকতুল্য করে তোলা হয়েছে। যার ফলে জাতিসংঘ কর্তৃক মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের নির্মূলের অভিযোগ উঠেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন দেশান্তরিকরণ চেষ্টা বর্মী শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ সৌদি আরবে চলে যাওয়ার একটি পরিসংখ্যান ইউকিপিডিয়া তুলে ধরেছে। মূলতঃ ধর্মীয় পরিচয়ই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামাজ আদায়ে বাধাদানসহ নির্বিচার গণহত্যার শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদের সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তাদের সংখ্যা যাতে বাড়তে না পারে সে জন্য বিয়ে করার অনুমতিও নেই তাদের। বৌদ্ধ রাখাইনদের টার্গেট হল রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের মাধ্যমে নির্মূল করে দেওয়া। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের রক্ষায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকেই বিশ্বমঞ্চে কার্যকর ও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক : সম্পাদক; চট্টগ্রাম লেখক-সাংবাদিক ফোরাম।