নীড়পাতা » সম্পাদকীয় » পোশাক খাত নিয়ে ষড়যন্ত্র : অর্জন ব্যাহতের আশংকা

পোশাক খাত নিয়ে ষড়যন্ত্র : অর্জন ব্যাহতের আশংকা

প্রতিটি জনকল্যাণমুখী সরকারের কাজ হওয়া উচিত গরীব দু:খী শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের অধিকার সুরক্ষা ও তাদের কল্যাণে কাজ করা। শ্রমিকসহ দেশের নি¤œ আয়ের মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন,তাদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, প্রয়োজনীয় বেতন ভাতাদির নিশ্চয়তা থাকলে তাদের কাছ থেকে কাজ পাবেন, সুফল পাবেন মালিক, সরকার। উপকৃত হবে অর্থনীতি, দেশ, জনগণ। এটা সত্য যে, দেশে শ্রমিক, কৃষক মজুরের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে মূলত: কল্যাণ সাধিত হয় তাদের পরিবার পরিজনের। এই গুরুত্ব বিবেচনায় বর্তমানে শেখ হাসিনার সরকার তাদের আগের মেয়াদে এবং বর্তমানে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। আর ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে এ জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে এর সঠিক প্রয়োগে দেশের শ্রমিক কর্মচারি সরকার, অর্থনীতি, দেশ ও জনগণের জন্য অপরিহার্য।
এমনি অবস্থা দেশের কলকারখানা,শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ দেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানীমুখী তৈরী পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে জড়িত শ্রমিক কর্মচারীর ভূমিকা অপরিসীম। কারণ বৈদিশক মুদ্রা অর্জনের মধ্য দিয়ে পোশাক শিল্প দেশকে সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের সোপানে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেন লক্ষ লক্ষ নারী ও পুরুষ শ্রমিক। কাজেই তাদের কাজ, চাকরি, কর্মপরিবেশ, সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের গামেন্টস শিল্প মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। দেশে আশির দশকে এই শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এই শিল্পের পরিপূর্ণ বিকাশ, এই শিল্পে জড়িত শ্রমিক কর্মচারিদের বেতন ভাতা বোনাস প্রভৃতির ব্যাপারে সরকার, মালিক পক্ষ সকলেই আন্তরিক এবং সর্তক রয়েছে। একজন শ্রমিক শুরুতে কমপক্ষে সর্ব নি¤œ বেতন উত্তোলন করছেন ৫ হাজার ৩০০ টাকা। ২০০৯ সালে পেতো ১৬০০ আর ২০১৩তে ৩৩০০ টাকা পেতো। এখন গামেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ভাতার জন্য রাস্তায় আন্দোলন করতে হয় না। ঈদসহ যে কোন উৎসব পার্বণের আগেই বেতন বোনাস পরিশোধসহ চাকরির নিরাপত্তা পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের শিশুসন্তান লেখা পড়া করলে তাদের নির্ধারিত পরিমান অর্থসহায়তা, কোন শ্রমিক অসুস্থ হলে চিকিৎসা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ, কর্মক্ষেত্রে দুগ্ধপোষ্য কর্মজীবী মহিলা শ্রমিকদের জন্য নিকটস্থ স্থানে ‘ফিডিং সেন্টারের’ সুযোগ, বিশ্রামাগার, ডরমেটরির সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
এটি বর্তমানে সীমিত আকারে চালু হলেও ভবিষ্যতে এটি পর্যাপ্ত আকারে সম্প্রসারণ করা হবে। শ্রমিকদের জন্য স্বল্প মূল্যে চাল,আটা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই শিল্প নিয়ে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্র এখনও থেমে নেই। কিছু দিন আগে আশুলিয়ায় এমন আত্মঘাতী কর্মকা- সংঘটিত হয়েছে। সেখানে অযৌক্তিক ইস্যুতে মাঠ গরম রাখা, শ্রমিকদের উস্কে দেয়া, রাজপথে ভাড়াটে শ্রমিক দিয়ে আন্দোলনের চেষ্টা করা হয়। এমনি প্রেক্ষাপটে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাজ হওয়া উচিত শ্রমজীবী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ও তাদেরকে নিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে, আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এই পরিকল্পনা সম্পন্ন হলে তাদের নিয়েই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল করা সম্ভব হবে। এতে অন্যান্য পেশার মানুষের মতো শ্রমিক কর্মচারির ভূমিকা রয়েছে। গামেন্টস শিল্পের যাত্রা আশির দশকে হলেও এর পূর্ণতা পায় নব্বই’র পরবর্তী সময়ে। কিন্তু এই যাত্রাপথ কখনো সুখকর ছিলনা। এরিই মধ্যে কালো দিন হিসেবে আসে তাজরীন ফ্যাশন দুর্ঘটনা, তার পর রানা প্লাজা ট্রাজেডি। অবশ্য এ দুর্ঘটনার পর সুযোগ সৃষ্টি হয় এই শিল্প নিয়ে নতুন করে ভাবনার। এর পর সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তৈরী পোশাক খাতে নতুন যুগের সূচনা ঘটে। বায়ারদের সংগঠন একর্ড এবং এলায়েন্স জোট গঠন, শ্রম আইন সংশোধন করা হয়। এ জন্য ২ বছর কাজ করে শ্রমিকবান্ধব শ্রমবিধি প্রণয়ন হয়। তৈরী পোশাক কারখানাসহ সমস্ত কলকারখানা দেখভাল করার জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়। ২৬৪ জন কলকারখানা পরিদর্শক রয়েছে। ৮৯ জন পরিদর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন, ২০১৮ সালের মধ্যে চাহিদা মতো জনবল নিয়োগ সম্পন্ন করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কলকারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিরূপণে সক্ষমতা অর্জন করবে। ২০১৮ সালের পরে এর্কড-এলায়েন্সের আর প্রয়োজন পড়বে না বলে প্রতিমন্ত্রী আশা করেন। এর ফলে প্রতিটি কলকারখানা নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
এ জন্য তৈরী পোশাক কারখানাগুলোকে ৪টি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে ৩৯ টি কারখানা বন্ধ করে দেয় হয়। কারখানাসমূহ নিয়মিত পরিদর্শন হলে দেশে আর তৈরী পোশাক কারখানায় আর কোন রানা প্লাজা বা তাজরিনের মতো ঘটনা ঘটবে না। এটা মনে রাখা দরকার, তৈরী পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ জিইয়ে রেখে এই শিল্পের উন্নয়ন, অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই এ শিল্পকে নিয়মিত মনিটরিং করার পাশাপাশি বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ’র মাধ্যমে প্রতিটি শ্রমিকের ডাটাবেজ তৈরী এবং শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনকে সহজীকরণ করা দরকার। ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধনের আগ পর্যন্ত তৈরী পোশাক শিল্প ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ছিল ৮২ টি। গত আড়াই বছরে ৪২৩ টি ট্রের্ড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন দেয়ায় শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।
পেশাগত অসুখের চিকিৎসায় গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যতদ্রুত সম্ভব এটি বাস্তবায়ন দরকার। অবশ্য এবারই প্রথম দেশে ২৮ এপ্রিল জাতীয়ভাবে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস পালন করা হয়েছে,তা ভবিষ্যতেও করা দরকার। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দক্ষ জনশক্তি জাতীয় সম্পদ, ২০১৯ সালের মধ্যে দক্ষ জাতিগঠনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এ বছর প্রথমবারের মত গত ১৫ জুলাই বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস পালন করা হয়। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কল্যাণের জন্য এ মন্ত্রণালয়। শ্রমিকদের কল্যাণে ২০০৬ সালে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়। বর্তমান সরকারের আগ পর্যন্ত এ তহবিলে জমার পরিমান ছিল মাত্র ৮ লাখ টাকা। আড়াই বছরের সময়ে ব্যবধানে আজ এ তহবিলে জমার পরিমান ২০০ কোটি টাকার বেশী। এই তহবিলে টাকা জমা দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উৎসাহে এ তহবিলের ভবিষ্যৎ উজ্বল। এই ফান্ড থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক/অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিক, দুর্ঘটনায় নিহত, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শ্রমিক, শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা, এবং সন্তান সম্ভবা নারী শ্রমিকদের এ তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যে সকল শ্রমিকদের সন্তান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তাদের জন্য ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা অর্থ সহায়তার দেয়া হচ্ছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মত শ্রমিকদের নামে প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শ্রমিক এক’শ টাকা দিলে সরকার এক’শ টাকা দেবে তার একাউন্টে। নির্দিষ্ট সময়ান্তে মোট জমার সাথে ২ লাখ টাকা যোগ করে সমুদয় অর্থ শ্রমিকদের দেয়া হবে। শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে এ অর্থপ্রদান করা হবে। এটি কার্যকর হলে শ্রমিকরা কাজে মনযোগ দিতে পারবে। সরকার শুধু তৈরী পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন করেছে। অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য এ ধরনের তহবিল গঠন করা দরকার। অবশ্য শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে রপ্তানীমুখী তৈরী পোশাক রপ্তানীর শতকরা ০.০৩ ভাগ অর্থ সরাসরি জমা হচ্ছে এ কেন্দ্রীয় তহবিলে। এ তহবিলে অর্থ জমা শুরু হয়েছে, বর্তমানে এ তহবিলে আজ পর্যন্ত জমার পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশী।
জনবান্ধব সরকার থাকলে উপকৃত হয় দেশের সর্বস্তরের মানুষ। এই বিবেচনায় শেখ হাসিনার সরকার জনগণের ও দেশের উন্নয়ন এবং কল্যাণে কাজ করছে। এর একটি প্রমাণ হচ্ছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের গৃহীত ‘গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া মাত্র গৃহকর্মী বিষয়ক কেন্দ্রীয় মনিটর সেল অভিযান পরিচালনা করছে। গৃহকর্মী নিয়োগ দিতে হলে তার কর্মঘন্টা, মজুরী নির্ধারণ, সাপ্তাহিক ছুটি ও থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মূলত: শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক গৃহকর্মী সামান্য ভুল ক্রটির কারণে অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামে মহিলা শ্রমিকদের জন্য শ্রম ভিাগের নিজস্ব জমিতে ৩ টি ডরমেটরি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনুরূপ বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় শ্রমমন্ত্রণালয় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ঈশ্বরদী ইপিজেডে উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া এলকা থেকে কর্মক্ষম মহিলাদের এনে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ প্রদান শেষে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। ইতোমধ্যে এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে ১২০০ মহিলাকে। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মহিলাদের কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বিনা ভাড়ায় এসব ডরমেটরিতে অবস্থান করবে। এসব পদক্ষেপ নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু আশংকা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সম্ভাবনাময় পোশাক খাত নিয়ে অব্যাহত ষড়যন্ত্রের কারণে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকা- বাধাগ্রস্ত না হয় সে দিকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। সরকারের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, ত্যাগের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে দেশের শ্রমিকসমাজ নিশ্চয় তা কারো কাম্য নয়।

লেখক : সাংবাদিক। সড়ঃধযবৎনফ১২৩@মসধরষ.পড়স