আরব ও মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিপর্যয় শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ অনলাইন মিডিয়া ইন্ডিপেনডেন্ট’এ প্যাট্রিক ককবার্নের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের এধরনের অভিপ্রায় সবসময় তার সক্ষমতার বাইরেই থেকে গেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে সৌদি শাসকদের এধরনের চেষ্টা গত কয়েক বছর ধরে কেন চরম ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে তার বিশ্লে­ষণ করা হয়েছে।
প্যাট্রিক বলেছেন, সিরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন সহ বিভিন্ন দেশে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপের পেছনে দেশটির ইরান ভীতি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির প্রভাবকে রোধ করতে ঘোষিত লক্ষ্য হিতে বিপরীত হয়েছে এবং সৌদিদের পতনের দ্বারপ্রান্তেপৌঁছে দিয়েছে। পরিস্থিতি আসলে সৌদি আরবের শক্তির বাইরে চলে যাচ্ছে।
সিরিয়ায় সৌদি আরবের পরোক্ষ হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে যখন দেশটির অর্থসাহায্যে আশীর্বাদপুষ্ট বিদ্রোহীরা পূর্ব আলেপ্পোতে প্রচ- মার খেয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে ইয়েমেনে রিয়াদের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ কলঙ্ক ছাড়া আর কিছুই তৈরি করছে না। ইয়েমেনে পতিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় পুনরায় বসাতে সৌদি আরব দেশটিতে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই এবং ১০ সহস্রাধিক মানুষ মারা গেছে, খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
সৌদি আরব চেয়েছিল সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন। সিরিয়ায় প্রচ- সামরিক চাপের মুখে রাশিয়া ও ইরানের কাছে বাশারকে সহায়তা চাইতে বাধ্য করে। ইরান ও রাশিয়া এভাবে বাশারের ডাকে এগিয়ে আসবে তা যুক্তরাষ্ট্র ভাবেনি। একই সঙ্গে গত ১৫ মাস ধরে ইয়েমেনে সৌদি আরব যে ধংসযজ্ঞ চালাচ্ছে সৌদি আরব তা শুধু গরীব আরব দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। উপরন্তু ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চলে সৌদি আরবের প্রতি দেশটির মানুষের বিতৃষ্ণা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সৌদি আরব যা করেছে তা দেশটি সহ সিরিয়া ও ইয়েমেনের জন্যে কোনো শুভকর কিছু বয়ে আনেনি।
বরং সৌদি শাসক, সহযোগী কাতার সহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যে ঔদ্ধত্য ও ইচ্ছামত সিরিয়া, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দিয়েছে ও দিতে অন্যদের প্রলুব্ধ করেছে তা এখন তাদের জন্যে বিপদ ডেকে আনছে। সৌদি আরবের আগ্রাসী নীতির ওপর তার ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা মিত্রদেশগুলো বিশেষ করে জার্মানি ভরসা রাখতে পারছে না। জার্মানির ফরেন ইন্টিলেজেন্স সার্ভিস বিএনডি গত ডিসেম্বর মাসে গভীর উদ্বেগ করে বলেছে, এধরনের সৌদি নীতি হচ্ছে, ‘হস্তক্ষেপের একটি আবেগপ্রবণ নীতি’ এবং তা সৌদি শাসকদের মাথায় কেবলি ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ফলে জার্মান সরকার সৌদি আরবের ব্যাপারে খুবই অপ্রস্তুত কারণ অতিরিক্ত সামরিক উচ্চাশা কোনো লক্ষ্যই পূরণ করতে পারেনি সৌদিদের। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে সৌদি আগ্রাসন মার খাচ্ছে ও মিত্রদেরকেও হতাশায় ফেলে দিচ্ছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে রিয়াদের এধরনের যুদ্ধংদেহী পররাষ্ট্রনীতি দেশটির প্রতি ্এক ধরনের বিরোধিতা তৈরি করছে এবং বাদশাহ সালমানের এধরনের নীতি দেশটির নির্বাহী কর্তৃত্ব কেন রোধ করতে পারছে না তারও সমালোচনা হচ্ছে। এছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যে নাইন ইলেভেনে সন্ত্রাসী হামলার পেছনে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্টতা থাকায়, দেশটির বিরুদ্ধে যে মামলার কথা বলা হচ্ছে সে দাবিও প্রবল হয়ে উঠছে।
সৌদি আরব সম্প্রতি যে ২০৩০ ভিশন ঘোষণা করেছে তা নিয়েও সন্দেহ ও উপহাস বাড়ছে। তেলের মূল্য পড়ে যাওয়ার পর দেশটি জালানি বহির্ভুত অর্থনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা বললেও আদতে একাধিক দেশের ওপর সামরিক আগ্রাসন বৃদ্ধি করেছে। যা পেট্রোডলার নির্ভর অর্থনীতিকে সামরিক আগ্রাসনে নিয়ে যাওয়ার পর তা থেকে দেশটি আদৌ সঠিক পথে ফিরে আসতে পারবে কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সৌদি আরবকে নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে এজন্যে যে তেল রফতানি করে অর্জিত অর্থ দেশটি মানব সম্পদ উন্নয়নে ব্যয় করেনি যে জন্যে কর্মসংস্থান বা দেশটির অর্থনীতিতে গতি পেছনের দিকেই গিয়েছে। এর ফলে আরব ও মুসলিম বিশ্বের ওপর সৌদি আরবের আধিপত্য সৃষ্টির কল্পনা কল্পনাই থেকে গেছে।
অথচ গত অর্ধশতক ধরে সৌদি আরব এধরনের ভুল ও আগ্রাসী নীতিতে চলে আসছে। সুন্নি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে আইএস জঙ্গিদের পেছনে সৌদি আরব যে অর্থ ঢেলেছে তা উইকিলিকসের গোপন তথ্য ফাঁসেও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্যের মাধ্যমে বের হয়ে এসেছে। ওপেকের সর্বশেষ সভায় সৌদি আরব অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন হ্রাস করার ওয়াদা করলেও তা রক্ষা করছে না কিন্তু সৌদি আরবের একচ্ছত্র ক্ষমতাধর বাদশাহ সালমান এখন দেখতে পাচ্ছেন সিরিয়ায় জাবাল আল-নুসরা তার সবধরনের সহায়তা সত্ত্বেও দাঁড়াতেই পারেনি, পিছু হটেছে এবং আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লি­ষ্টতা তাদের কোনো কাজে আসেনি। ইয়েমেনের ২৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার অন্তত ৬০ ভাগ মানুষ বরং বাদশাহর চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসনের মুখে দুর্ভিক্ষে পতিত হয়েছে।
এছাড়া সৌদি আরবে এক কোটি বিদেশি শ্রমিক যা দেশটির জনসংখ্যার তিন ভাগের একভাগ, তাদের অনেকেই ঠিকতম পারিশ্রমিক না পেলেও কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না দোররা অথবা কারাভোগের ভয়ে। মিশর, সিরিয়া ও জর্ডান, ইসরায়েলের ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছে সৌদি আরবকে।
কারণ সৌদি রাজতন্ত্রের ওপর এখন সামরিক জাতীয়তাবাদ ভর করেছে। একই সঙ্গে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও বাহরাইনে শিয়া সুন্নি মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির নীতি বাস্তবায়ন করে এসব দেশে স্থিতিশীলতা সৌদি আরব তার পশ্চিমা মিত্রদেশগুলোর স্বার্থে বিনষ্ট করে আসলেও কোনো লাভ হয়নি। বরং এসব দেশে পাল্টা বিপ্লব শুরু হয়েছে যার ঢেউ সৌদি আরব পর্যন্তঅদূর ভবিষ্যতে পৌঁছাতে পারে।
সৌদি আরব ও কাতারের রাজনীতির সমালোচকরা বলছেন, দেশদু‘টি চতুরতার সঙ্গে আগ্রাসী নীতি নিয়ে আগালেও যে সব দেশে তা প্রয়োগ করেছে সেসব দেশের বাস্তব পরিস্থিতি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেনি। কাতার মনে করেছিল সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পরিণতি লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফির মতই হবে। তা না হওয়ায় কাতার সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দিয়ে আশা করতে শুরু করে লিবিয়ায় যেমন ন্যাটো সামরিক আগ্রাসন করেছিল তেমনি যুক্তরাষ্ট্র হয়ত সিরিয়ায় তা করতে এগিয়ে আসবে।
আল-কায়েদার পেছনে সৌদি অর্থের যোগান ছিল পুরোনো বিষয়, নতুন বিষয় পরিস্কার হয় যে আইএস জঙ্গি আদতে আল-কায়েদার ক্লোন ছাড়া আর কিছুই নয়। বিষয়টি নিয়ে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এ কার্লোটা গল এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত লিখতে যেয়ে বলেন, তালেবান অর্থমন্ত্রী আগা জান মোতাসিম ঘন ঘন সৌদি আরব সফর করতেন এবং প্রাপ্ত অর্থ আফগানিস্তানে তালেবানদের পেছনে খরচ করা হত।
সম্প্রতি আফগান সরকার বলেছে, ৪০ হাজার তালেবানের পেছনে অন্তত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করা হত।
সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরের কতিপয় দেশের এধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা শুধু আরব নয় সুন্নি মুসলিম বিশ্বেও ক্ষতি ডেকে এনেছে। ইরান থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্তআরব দেশগুলোর এধরনের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের মধ্যে ইরাকের মসুলে আইএস জঙ্গিদের পতন ও সিরিয়ায় আলেপ্পো থেকে আইএস জঙ্গিদের পলায়ন বড় ধরনের ভূ-কৌশলগত মোড় পরিবর্তনের অপচেষ্টা বানচাল করেছে।
[সূত্র : ইন্ডিপেন্ডেন্ট]